উমাশঙ্কর : হিমালয়ের জন্ম হয়নি তখনও। পৃথিবী তখন রূপ বদল হচ্ছে ক্রমাগত। সেই প্রি-ক্যামব্রিয়ান যুগে আজ থেকে প্রায় ২৫০ কোটি বছর আগে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল আরাবল্লি। এটি কেবল ভারতের নয়, পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত। কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে প্রকৃতির ঝড়-ঝাপটা সহ্য করে টিকে থাকা এই পর্বতমালা আজ মনুষ্য সৃষ্ট এক ভিন্ন ঝড়ের সম্মুখীন। সংজ্ঞার ফাঁদে পড়ে অস্তিত্বের সংকটে পৃথিবীর গর্ব এই পর্বত, তাই আরাবল্লির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন উত্তাল পরিবেশবিদ থেকে বিজ্ঞানীরা। এই প্রতিবেদনে আমরা খোঁজার চেষ্টা করব আরাবল্লি পর্বতের বিজ্ঞানসম্মত গুরুত্ব এবং বর্তমান সংঘাতের মূল কারণ।
বিজ্ঞানের চোখে আরাবল্লি কোনো সাধারণ পাথরের স্তূপ নয়। এটি দিল্লি, হরিয়ানা এবং রাজস্থানের অস্তিত্বের সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আরাবল্লি থর মরুভূমি এবং উর্বর গাঙ্গেয় সমভূমির মাঝে একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর। যা ধ্বংস হলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল গ্রাস করতে পারে থর মরুভূমি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, আরাবল্লি ক্ষয়প্রাপ্ত হলে বালির ঝড় অবাধে দিল্লি ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে প্রবেশ করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করতে পারে।
আরাবল্লির শিলাস্তর (Quartzite rocks) অত্যন্ত ফাটলযুক্ত ও সছিদ্র। এটি বৃষ্টির জলকে স্পঞ্জের মতো শুষে নিয়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে (aquifer) পৌঁছে দেয়। দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জলের জোগান নির্ভর করে এই প্রাকৃতিক রিচার্জ সিস্টেমের ওপর।
উত্তর ভারতের তীব্র তাপপ্রবাহ রুখতে এবং স্থানীয় স্তরে আর্দ্রতা ধরে রাখতে আরাবল্লির জঙ্গল একটি ‘Micro-climate’ বা স্বতন্ত্র ক্ষুদ্র জলবায়ু অঞ্চল তৈরি করে।
অর্থাৎ ভুপ্রাকৃতিক এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এই পর্বতের গুরুত্ব অপরিসীম।
আরাবল্লির সংরক্ষণ নিয়ে বর্তমানে ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট নীতিগত মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ ছিল অবাধে খনন।
২০০৯ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট হরিয়ানার আরাবল্লী অঞ্চলে খনির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কারণ ছিল অবাধ খনন পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৮৬ লঙ্ঘন করছে, বন ধ্বংস করছে এবং জলস্তর নামিয়ে দিচ্ছে। সেই সময় আদালতের মন্তব্য ছিল আরাবল্লীর সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞার অভাব থাকায় রাজ্যগুলির মধ্যে প্রয়োগে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। এই অস্পষ্টতাই পরবর্তী এক দশকের বেশি সময় ধরে খনি ও নির্মাণের ফাঁকফোকর তৈরি করেছে।
২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রককে নির্দেশ দেয় আরাবল্লী পর্বতের একটি অভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা জমা দিতে। কিন্তু ২০২৪ সালে কেন্দ্র আরাবল্লীর সংজ্ঞা দেয়। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, আশপাশের ভূমির তুলনায় যেসব ভূমির আপেক্ষিক উচ্চতা কমপক্ষে ১০০ মিটার, কেবল সেগুলিকেই আরাবল্লী পর্বত হিসেবে গণ্য করা হবে। অথচ ভূমিরূপের উচ্চতার হিসেব সমুদ্রসমতল থেকে করা হতে থাকে।
২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই সংজ্ঞা গ্রহণ করে। একই সঙ্গে কেন্দ্রকে একটি সাসটেইনেবল মাইনিং প্ল্যান তৈরির নির্দেশ দেয় এবং নতুন খনির অনুমতি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে।
এই সংজ্ঞা মেনে নেওয়ার পেছনের কারণগুলি হলো, আরাবল্লির খনন নিয়ে হাজার হাজার মামলা, আরাবল্লি লাগোয়া রাজ্যগুলির পাহাড় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত, সর্বোপরি ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (FSI) এবং সেন্ট্রাল এমপাওয়ার্ড কমিটি (CEC) এর রিপোর্ট।
ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বক্তব্য পুরোনো মানচিত্র এবং স্যাটেলাইট ইমেজের উপর ভরসা করে ছোটখাট টিলাগুলোকে পাহাড় হিসেবে চিহ্নিত করা প্রশাসনিক ভাবে জটিল। তাই এর সুস্পষ্ট সীমারেখা প্রয়োজন। আবার অনেক সমতলভূমির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 100 মিটারের বেশি, তাই পাহাড়ের উচ্চতায় টিলার পাদদেশ থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা 100 মিটার বা তার বেশি হতে হবে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই সংজ্ঞাটি আরাবল্লির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ হলো,
দিল্লি ও হরিয়ানায় আরাবল্লির বহু অংশ নিচু পাথুরে টিলা বা ‘Ridge’ আকারে বিস্তৃত, যার উচ্চতা ১০০ মিটারের কম।
এই সংজ্ঞা কার্যকর হলে আরাবল্লির প্রায় ৯০% বেশি এলাকা আইনি সুরক্ষা হারাবে এবং সেখানে খনন বা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হবে।
এই ক্ষেত্রে হয়তো আরাবল্লীর মাথাটা বেঁচে যাবে কিন্তু দেহ খন্ডকে রক্ষা করা কোনোভাবেই যাবে না।
বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম উচ্চতা দিয়ে বিচার করা যায় না; একটি ২০ মিটার উঁচু টিলাও ভূগর্ভস্থ জল রিচার্জে ১০০ মিটার উঁচু পাহাড়ের সমান ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশকর্মী, নাগরিক সমাজ এবং বিরোধী দলগুলো সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে। ‘আরাবল্লি বাঁচাও’ আন্দোলনের কর্মীদের মতে, সরকার রিয়েল এস্টেট এবং খনি মাফিয়াদের সুবিধা করে দিতেই আইনের এই পরিবর্তন আনতে চাইছে। তাঁদের দাবি, আরাবল্লিকে ‘ন্যাচারাল কনজারভেশন জোন’ (NCZ) হিসেবে ঘোষণা করে এর প্রতিটি ইঞ্চি জমি রক্ষা করতে হবে।
সেই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, পরিবেশ বিধি শিথিল করে সরকার কর্পোরেট স্বার্থ চরিতার্থ করছে। তাঁদের মতে, আরাবল্লি ধ্বংস হলে দিল্লি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।
সে যাই হউক, আরাবল্লীর সংজ্ঞা পরিবর্তনের পিছনে যে মাইনিং কর্পোরেটদের গভীর ছায়া আছে তা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। ১০০ মিটারের সংজ্ঞার ফলে হরিয়ানার হাজার হাজার একর জমি ‘পাহাড়’-এর তকমা হারিয়েছে। এই জমিগুলো এখন সমতল ভূমি হিসেবে গণ্য হবে। ফলস্বরূপ, বড় বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো এখানে হাই-রাইজ বিল্ডিং, শপিং মল বা ফার্মহাউস তৈরির আইনি অধিকার পেয়ে যাবে। আরাবল্লি হলো নির্মাণ সামগ্রীর সবচেয়ে বড় উৎস। ১০০ মিটারের কম উচ্চতার টিলাগুলো যদি ‘পাহাড়’ না হয়, তবে সেখানে পাথর খাদান বা ক্রাশার জোন তৈরি করতে আর আইনি বাধা থাকবে না। সিমেন্ট এবং নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বড় কোম্পানিগুলো এতে সরাসরি লাভবান হবে।
বিজ্ঞান আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, আরাবল্লি কেবল একটি পর্বত নয়, এটি উত্তর ভারতের ‘ফুসফুস’ এবং ‘জলপাত্র’। সুপ্রিম কোর্ট বর্তমানে রক্ষাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু আইন ও নীতির এই দড়ি টানাটানিতে আরাবল্লির ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা মরুভূমিকরণ এবং জলশূন্যতার বিনিময়ে নয়। আরাবল্লী যদি তার সবুজ বর্ম হারায়, তবে বিজ্ঞানের সতর্কবাণী অনুসারে প্রকৃতি তার বকেয়া বুঝে নেবে, এবং তার মূল্য চোকাতে হবে আমাদের আগামী প্রজন্মকে।
ছবি : স্বপ্নেন্দু কুন্ডু

