নিজস্ব সংবাদদাতা , পুরুলিয়া
৬ অক্টোবর , ২০২০

যা কোনদিন ঘটেনি, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এবার তাই ঘটছে।দুহাজার বছরের প্রাচীন কাশীপুর রাজবাড়ির পুজোতে এ বছর দর্শনার্থীদের প্রবেশে লাগাম দিতে হচ্ছে। এমনকি সংক্রমণের সমস্ত সম্ভবনা এড়াতে সরকারি বিধি মেনে কি কি উপায়ে এ বছর শিখর বাসিনী দেবীর পুজোতে একদিকে মানুষের ভিড় সামলানাে এবং অন্যদিকে প্রচলিত প্রথা বা উপাচারগুলি রক্ষা করা যাবে, তার জন্য দফায় দফায় রাজ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ইতিমধ্যে আলােচনাও হয়েছে, বলছেন বর্তমানে কাশীপুর রাজ পরিবারের অন্যতম সদস্য স্বৰ্গৰ্ত নীলমণি প্রসাদ সিং দেও-র প্রপৌত্র সােমেশ্বরলাল সিং দেও।বহু প্রাচীন এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানান বিশ্বাস আর উপাখ্যান। একসময় ঐতিহ্য মেনে সন্ধ্যি পুজোতে তােপধ্বনি হত। এখন সেসব অতীত। কিন্তু বিশ্বাসে ভর দিয়ে বহু দূরদূরান্ত থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতারা আজও ছুটে আসেন কাশীপুরের রাজবাড়ির পুজো দেখতে। বহু মানুষ মানত রাখেন, মানত পরিশােধ করেন বহু। তাঁদের বিশ্বাস, কল্যাণেশ্বরীর প্রতিমূর্তি সরূপিনী রাজরাজেশ্বরীর আলয়ে যে শিখরবাসিনী বিরাজ করছেন, তিনি তাঁদের মঙ্গল করবেন।

ফলে এ বছর সরকারি বিধি মেনে এই বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থীদের বিশ্বাসেও যাতে আঘাত না লাগে, সে দিকটাও বিশেষভাবে রাজবাড়ির সদস্যদের চিন্তা করতে হচ্ছে বলে মত সােমেশ্বরবাবুর। জানা গিয়েছে, আনুমানিক দু হাজার বছর পূর্বে, তৎকালীন উজ্জয়িনীর ধারনগরের মহারাজা জগদ্দেও প্রসাদ সিং দেও-র কনিষ্ঠপুত্র তথা রাজা বিক্রমাদিত্যের সপ্তম পুরুষ মহারাজা দামােদর শেখর সিং দেও এই জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায় চাকলা পঞ্চকোট স্টেট স্থাপন করেন।তাঁর নামানুসারে এই বিস্তীর্ণ এলাকার নাম হয় “শিখরভূম”।তখন থেকেই রাজ পরিবারের পুজোর সূচনা। আর শিখরভূমের দেবী বলেই কুলদেবীর পুজো শিখরবাসিনী’র পুজো বলে পরিচিত। কুলদেবীর নাম রাজরাজেশ্বরী। পরবর্তীকালে পাঞ্চেত, পাড়া,কেশরগড়, কাশীপুর ইত্যাদি যেখানে যেখানে যেমন যেমন রাজত্ব স্থানান্তরিত হয়েছে এই পুজোও স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু পুজোরমূল উপাচার এবং নিয়ম সেই দু হাজার বছরের প্রাচীন সময় থেকেই একই রয়েছে, বলছেন সােমেশ্বর লাল সিং দেও।

কাশীপুর রাজবাড়ির মূল দেবী মূর্তি অষ্টধাতুর।চতুর্ভুজা।বর্তমানে এই পুজোর দেবত্তোর সেবায়েত জগদানন্দ প্রসাদ সিং দেও। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী আজও ১৬ দিনের বা ১৬ কল্পের পুজো। জিতা অষ্টমীর পরের দিন দেবীর বােধনের মাধ্যমে পুজোর শুরুহয়। মহালয়ার পরে দেবী পক্ষের নবমী পর্যন্ত মােট ১৬ দিন ষােড়সপােচারে, বিভিন্ন নামে ঘট স্থাপন করে পুজো করা হয় রাজরাজেশ্বরী মাতার। ১৬ দিন ধরে জ্বলতে থাকে অখণ্ড প্রদীপ। বিজয়া দশমীতে ঘট বিসর্জনের মাধ্যমে পুজোর সমাপ্তি ঘটে। এ বছর পুরাে আশ্বিন মাসটা মলমাস।তাই এবার মহালয়ার অমাবস্যা পর্যন্ত প্রথমে ৭ দিন এবং পরে কার্তিকের শুরু থেকে পরের অমাবস্যায় দেবী পক্ষের নবমী পর্যন্ত ৯ দিন, মােট ১৬ দিন ষােড়শপােচারে পুজো করতে হচ্ছে।“মাঝের একটি গােটাপুরুষােত্তম মাস অখন্ড প্রদীপ জ্বালিয়ে পঞ্চপাচারে পুজো করা হচ্ছে” বলে জানান সােমেশ্বরবাবু।

কাশীপুর রাজবাড়ির পুজো বীরকারী তন্ত্র মতে অনুষ্ঠিত হয়। প্রচলিত প্রবাদ, “মল্লে রা শিখরে পা…”। কথিত আছে, প্রতি বছর মহাষ্টমীর সন্ধ্যি পুজোর সময় নাকি সিঁদুরের থালায় রাজরাজেশ্বরী দেবীর দুটি পায়ের ছাপ পড়ে। বহু প্রাচীন কাল থেকেই হয়ে আসছে এই ঘটনা। সেইজন্য শিখর বাসিনীর সন্ধ্যি পুজোয় মন্দিরের ভেতর কেবলমাত্র রাজপরিবারের সদস্যরা ছাড়া আর কারাে থাকার অনুমতি নেই। সেই প্রাচীন সময় থেকেই এই নিয়মও চলে আসছে। কাশীপুরের রাজরাজেশ্বরী দেবী নিয়ে এ রকম বহু উপাখ্যান ছড়িয়ে আছে মানুষের মধ্যে। ফলে বিশ্বাস আর দর্শনের ইচ্ছা নিয়ে সারা বছরমন্দিরে দর্শনার্থীদের আসা যাওয়া। দরজা খােলা থাকে সারা বছর। পুজোর এই ১৬ দিনের প্রথম দিন থেকেই শিখরবাসিনীর পুজোতে দর্শনার্থীদের ভিড় আরাে বেড়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য দর্শনার্থীদের ভিড় হয় প্রতি বছর। ওই বােধনের দিন থেকেই বহু মানুষ মানত পরিশােধ করতেও আসেন মন্দিরে। পাঁঠা বলি দিতে আসেন দলে দলে।

এ বছর কিন্তু করােনার কারণেই দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে ১৬ দিন কপাটবন্ধ রাখা হবে। জানা গিয়েছে যাঁরা মানত পরিশােধ করতে আসছেন তাঁদের স্যানিটাইজ করে এক এক করে ঢােকানাে হচ্ছে। যাতে করে মন্দিরের ভেতরে ভিড় না জমে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। মূলত দেবী দর্শনে যে এবার ভক্তদের ভিড় এড়াতে লাগাম থাকছেই, তা স্পষ্টতই বলে দিয়েছেন সােমেশ্বরবাবু। আরাে বলেন, দেবী পক্ষের যষ্ঠি বা সপ্তমী থেকে যে চার-পাঁচ দিন, তাতেও দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে লাগাম থাকবে।তবে রাজ পরিবারের সকলেই উপস্থিত থাকবেন। যা যথাসম্ভব প্রাচীন এই পুজোর শাস্ত্রীয় ও পারিবারিক সমস্ত আচার পালন করা হবে ঠিকই, তবে এ বছর কোন আড়ম্বর থাকছে না বলে জানিয়েছেন সােমেশ্বর লাল সিং দেও।

শেয়ার করুন

You cannot copy content of this page