নিজস্ব সংবাদদাতা, পুরুলিয়া, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ঃ

৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, রবিবার শিক্ষক দিবসের দিন পুরুলিয়ার জেলা শাসক দপ্তরে একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষারত্ন সম্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেওয়া হল জেলার তিনজন শিক্ষাকর্মীর হাতে। এ বছরের সেরা বিদ্যালয়ের পুরস্কারও এদিনই পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বলরামপুরের রাঙাডি শ্রী ভজনাশ্রম উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক ডঃ দয়াময় রায়, সিধু-কানু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক তথা গবেষক ডঃ অর্ধেন্দু শেখর পাত্র ও লালপুর মহাত্মা গান্ধী কলেজের অধ্যক্ষ তথা রসায়ন বিষয়ের গবেষক ডঃ শান্তি কুন্ডু-র হাতে এদিন রাজ্য সরকারের পক্ষে সম্মাননা পত্র সহ ২৫ হাজার টাকা করে পুরস্কার মূল্য তুলে দেন পুরুলিয়ার জেলা শাসক রাহুল মজুমদার। সেরা বিদ্যালয়ের সম্মাননা পত্র সহ এক লক্ষ টাকার পুরস্কার মূল্য তুলে দেওয়া হয় পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের কর্তৃপক্ষের হাতে।

শিক্ষারত্ন সম্মান পেয়ে ভীষণ খুশি রাঙাডি শ্রী ভজনাশ্রম উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ডঃ দয়াময় রায়। জানাচ্ছেন, দীর্ঘ ২৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনে খুব বড় পাওনা। পুরুলিয়া-২ ব্লকের অন্তর্গত বাতিকরায় ১৯৬৩ সালের ১০ জুলাই জন্ম ডঃ দয়াময় রায়ের। হুটমুড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন। বাংলা নিয়ে রঘুনাথপুর কলেজ থেকে স্নাতক এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন দয়াময় বাবু। পরে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই “মানভূমের ভাষা আন্দোলন” বিষয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট এবং পুরুলিয়া শিক্ষক শিক্ষণ মহাবিদ্যালয় থেকে বি এড ডিগ্রি অর্জন। পেশায় শিক্ষক হলেও একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, লোক গবেষক দয়াময় রায় ১৯৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল বলরামপুরের রাঙাডি শ্রী ভজনাশ্রম উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনের শুরু করেন। টানা ২৯ বছর সেখানেই শিক্ষকতা করছেন দয়াময় রায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্ষদ কর্তৃক স্বীকৃত বেশ কিছু টেক্সট বই ও ব্যাকরণ বইয়ের প্রণেতা তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের পাঠ্যক্রম অনুসারে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও বাংলার শিল্প সংস্কৃতির ইতিহাস গ্রন্থেরও প্রণেতা দয়াময় রায়। রাজ্যের বহু বিদ্যালয়েই তাঁর বই পাঠ্য সূচীর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও লোক সংস্কৃতির ওপর রয়েছে চারটি গ্রন্থ। প্রয়াত পদ্মশ্রী ছৌ শিল্পী গম্ভীর সিং মূড়া-র জীবন ও শিল্পকর্ম বিষয়ক তাঁর গবেষণা লব্ধ গ্রন্থটি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। দয়াময় রায়ের দুটি কাব্য গ্রন্থ ছাড়াও সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার উপর তাঁর গ্রন্থটিও বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এবছর শিক্ষারত্ন সম্মান বিষয়ে রাজ্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের কর্মজীবনে “খুব বড় পাওনা” বলে উল্লেখ করেছেন দয়াময় রায়।

এবছর শিক্ষারত্ন সম্মান পাচ্ছেন সিধু-কানু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডঃ অর্ধেন্দু শেখর পাত্র। কথার শুরুতেই তিনি বলেন, “এই পুরস্কার আমার কর্ম জীবনের মাইল স্টোন”। রাজ্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন “খুব বড় পাওনা।” একই সঙ্গে সম্নানিত হয়ে খুশিও অধ্যাপক অর্ধেন্দু শেখর পাত্র। মূলত মেদিনীপুরের ঘাটালের বাসিন্দা হলেও কর্ম সূত্রে দীর্ঘদিন ধরে পুরুলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা। ২০১৩ সাল থেকে পুরুলিয়ার সিধু-কানু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত প্রফেসর অর্ধেন্দু শেখর পাত্র। জানান, ইতিমধ্যে তাঁর হাত ধরে পদার্থ বিজ্ঞানের এ পর্যন্ত ৯ টি ব্যাচ বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে গিয়েছে। তাঁর নিজের গবেষণার বিষয় ছিল “অপটিক্যাল ফাইবার কমিউনিকেশন”। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাওয়ার পর অর্ধেন্দু শেখর পাত্র গুয়াহাটি আই আই টি থেকে অপটিক্যাল ফাইবার কমিউনিকেশন বিষয়ে গবেষণা করে পি এইচ ডি অর্জন করেন। এরপরই হলদিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে চাকরি জীবনের শুরু। সেখানে চাকুরিরত থাকতে থাকতেই দুবছরের উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ পাড়ি দেন। দেড় বছর তাইওয়ান এবং ছয়মাস জার্মানিতে থেকে অর্ধেন্দু বাবু অর্জন করেন পোস্ট ডক্টরেট ফেলশিপ। দেশে ফিরে পুনরায় হলদিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে চাকুরি শুরু করেন। ২০১৩ সালে পদার্থ বিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন পুরুলিয়ার সিধু-কানু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে অপটিক্যাল ফাইবার কমিউনিকেশন বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বেশ কয়েকটি গবেষণা মূলক প্রোজেক্টের কাজও করছেন অর্ধেন্দু শেখর পাত্র।

চলতি বছরে জেলার অপর একজন শিক্ষারত্ন হলেন লালপুর কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ শান্তি কুন্ডু। পুরস্কৃত হওয়ার সংবাদটি রাজ্য উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের চিঠি মারফত জানতে পেরেছেন বুধবার নাগাদ। রাজ্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে শান্তি বাবু বলেন, বিষয়টি নিঃসন্দেহে অ্যাচিভমেন্ট। তবে একটি কলেজের অধ্যক্ষকে এই সম্মান জানানো মানে কেবল একজন ব্যাক্তিবিশেষকে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে কলেজকেই সম্মান জানানো বলে অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন লালপুর মহাত্মা গান্ধী কলেজের অধ্যক্ষ তথা রসায়ন বিদ্যার গবেষক ডঃ শান্তি কুন্ডু। এ বিষয়ে তাঁর অভিমত, “আমি মনে করি এই ধরনের পুরস্কারের অর্থ হল সামগ্রিকভাবে কলেজের উন্নয়নকে পুরস্কৃত করা”। গ্রামীণ বা মফস্বলের কলেজগুলির ওপরও যে সরকারের যথেষ্ট সংবেদনশীল নজর রয়েছে, এটা তারই প্রমাণ বলেই মনে করেন শান্তি বাবু।

শান্তি কুন্ডুর গবেষণার বিষয় ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির অন্তর্গত ফটো কেমিস্ট্রি। ঘাটাল সাব ডিভিশনের দাসপুর থানার আদি বাসিন্দা ডঃ শান্তি কুন্ডু মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছেন। পরে দুবছর জাপান ও দুবছর জার্মানি, মোট চার বছর বিদেশে পোস্ট ডক্টরেট ফেলশিপ। দেশে ফিরে ২০০২ সালে পুরুলিয়া শহরের নিস্তারিণী মহিলা কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। ২০১৬ সালে লালপুর মহাত্মা গান্ধী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন। জানালেন পুরুলিয়ার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আত্মিক যোগ। বিগত দুবছর, কোভিড পরিস্থিতিতে প্রতিটি ওয়ার্কিং ডে-তে নিয়মিত কলেজ গিয়েছেন লালপুর কলেজের অধ্যক্ষ। শান্তিবাবু বলেন, সবই অনলাইনে ছিল। কলেজের অন্যান্য সমস্ত স্তরের কর্মীদের ক্ষেত্রে কোভিড পরিস্থিতিতে তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তার কারনে সশরীরে কলেজ আসার বিষয়ে ছাড় দেওয়া ছিল। কিন্ত আমি নিজে ওই পরিস্থিতিতেও প্রতিটি ওয়ার্কিং ডে-তে কলেজে উপস্থিত থেকেছি। শান্তি বাবুর বক্তব্য, কলেজের প্রশাসনিক বা পঠনপাঠনের উন্নয়নের পাশাপাশি কলেজের পরিবেশটিরও লক্ষ রাখা একান্ত জরুরি ছিল।

শেয়ার করুন

You cannot copy content of this page