নিজস্ব সংবাদদাতা, পুরুলিয়া, মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪ঃ

নিজস্ব সংবাদদাতা, পুরুলিয়াঃ শনিবার বিক্ষিপ্ত অতি সামান্য কিছু ঘটনা ছাড়া পুরুলিয়া লোকসভায় নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হল অষ্টাদশ সাধারণ নির্বাচনের ষষ্ঠ চরন। এই লোকসভা কেন্দ্রে ভোট পড়েছে প্রায় ৭৮.৩৯ শতাংশ। রবিবার রাত সাড়ে আটটা নাগাদ জেলা নির্বাচন দপ্তর ভোটের হার জানিয়ে দেয়। পুরুলিয়া লোকসভায় ৭৮ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার খবর চাউর হতেই রাজনৈতিক মহলে জোর প্রশ্ন উঠেছে, “পুনরাবৃত্তি না কি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত !”

রাজনৈতিক মহলের প্রশ্নটি খোলাসা করে বুঝতে গেলে একটু বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, শনিবার মূলত জঙ্গলমহলের ৮ টি লোকসভা কেন্দ্রের ভোট গ্রহন পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। জঙ্গলমহলের ৮ টি কেন্দ্রে গড়ে ভোট পড়েছে ৮২.৭১ শতাংশ। ৮ টি লোকসভা কেন্দ্রের তিনটিতে ভোট শতাংশ প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং চারটিতে ৮০ থেকে ৮৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। তুলনামূলকভাবে পুরুলিয়া কেন্দ্রে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে, ৭৮.৩৯ শতাংশ।

উপরের ভোটের হিসেবই কিন্তু জেলার রাজনৈতিক পরিসরে নানান জল্পনা আর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কেন? কারন দুটি। প্রথমতঃ, চলতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে এ পর্যন্ত বিগত পাঁচটি চরনকে বহু নীচে ফেলে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ল ষষ্ঠ দফায় এবং দ্বিতীয়ত, শনিবারের ভোটে অবিকল ২০১৯-এর নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। তাহলে পাঁচ দফা ভোট পর্যন্ত ভোট সমীক্ষকদের যাবতীয় আলোচনা বা অনুমানে কি কার্যত জল ঢেলে দিয়েছে ষষ্ঠ দফার ভোট? ৪ ঠা জুনের আগে জেলার আনাচে কানাচে এটাই এই মূহুর্তে লাখ টাকার প্রশ্ন।

বিগত লোকসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান এসময় এই আলোচনার সবচেয়ে বড় প্রামাণিক উদাহরণ। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রে ভোট পড়েছিল ৭৭.৬০ শতাংশ। যার মধ্যে বৈধ ভোট ছিল ৭৬.৩০ শতাংশ। রেকর্ড (২,০৪,৭৩২) ভোটে জয়ী হয়েছিল বিজেপি। সেবার তাদের জয়ের হার ছিল ১৫.১২ শতাংশের মত। বিশেষভাবে লক্ষ করার বিষয় যে, শুধুমাত্র পুরুলিয়াতেই বিজেপির এই জয় হয়নি ২০১৯-এ। জঙ্গলমহলে কার্যত বিজেপির একটা ভীষণ উত্থান দেখা গিয়েছিল সেবার। পুরুলিয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, কাঁথি সহ বেশ কয়েকটি লোকসভা আসন তৃণমূলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় তারা। ঘাটাল, তমলুক সহ যেগুলিতে তৃণমূল জয়ী হয়, সেগুলিতেও বিজেপির তীব্র কামড়ের দাগ দেখা গিয়েছিল। এককথায় গোটা জঙ্গলমহলের বুক চিরে গেরুয়া সুনামি যেন প্রকট হয়ে ফুটে উঠেছিল। যেটা উল্লেখযোগ্য বিষয়, তা হল সেবার (২০১৯) জঙ্গলমহলের এইসব আসনগুলিতে বিপুল পরিমাণে ভোটের হারে বৃদ্ধি। গড়ে এই এলাকায় ২০১৯-এ ভোট পড়েছিল ৮০ শতাংশের চেয়ে কিছু বেশি। পুরুলিয়া লোকসভায় তুলনামূলক কম, ৭৭.৬০ শতাংশ। শনিবারের নির্বাচন পর্বের শেষে কিন্তু ভোটের হারের যে পরিসংখ্যান উঠে আসছে, তা কার্যত গত লোকসভা নির্বাচনের (২০১৯) একেবারে প্রতিচ্ছবি। প্রথমত, ১৯ এপ্রিল ২০২৪ থেকে বিগত পাঁচ চরনের ভোটের হারকে অনেকটা পেছনে ফেলে শনিবার মূলতঃ জঙ্গলমহলের ৮ টি লোকসভা কেন্দ্রে ভোট পড়ার হিসেব একলাফে ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেল (৮২.৭১ শতাংশ) এবং দ্বিতীয়ত, অবিকল ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের প্রতিফলন ঘটিয়ে ৮ টি আসনের গড় হিসেব থেকে পুরুলিয়া লোকসভায় (৭৮.৩৯ শতাংশ) মোটামুটি সাড়ে চার শতাংশ ভোটের হারে ঘাটতি থাকল। আর ঠিক এই বিষয়টিতে এসেই জেলার রাজনৈতিক মহলে বিস্তর জলঘোলা, “তাহলে কি ২০১৯-এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে এই কেন্দ্রে, না কি এবার অন্য কিছু বা নতুন কোন রাজনৈতিক সমীকরণের ছবি ফুটে উঠতে চলেছে”? যে কোন নির্বাচনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানের সংশ্লিষ্ট শাসক দলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ বা ক্ষোভ বেশি থাকে। বিশেষত সেই শাসক যদি আবার দুটি বা তিনটি টার্ম ধরে টানা শাসন করছে। তবে একইসঙ্গে রাজ্যের প্রধান বিরোধী আবার কেন্দ্রের শাসক। ফলে উভয়েরই শাসন ব্যবস্থা বিষয়ে কমবেশি মোটামুটি ওয়াকিবহাল পুরুলিয়া লোকসভার “ভোটাররা”। শনিবারের পর শাসক-বিরোধী উভয়েই জয়ের ঢাক বাজাচ্ছে নিজেদের পক্ষে। যদিও এখুনি চূড়ান্ত ফল নিয়ে কিছু বলা মুশকিল। কারণ, ভুললে চলবে না যে, এবার প্রাক্ নির্বাচনী পরিবেশে পুরুলিয়া সহ জঙ্গলমহলের একাধিক এলাকায় একদিকে যেমন বামেদের পুনরুত্থানের ছবি ফুটে উঠেছে, ফুটে উঠেছে বাম-কংগ্রেস জোটের জমজমাট মিটিং মিছিলের ছবি, অন্যদিকে তেমনি কুড়মি সমাজের প্রার্থীদের সমর্থনে তাদের কর্মী-সমর্থকদের উন্মাদনাও ছিল চোখে পড়ার মত। মিটিং-মিছিল-প্রচারের ভিড় হয়ত সবসময় জয়-পরাজয়ের প্রধান অনুঘোটক নয়, তবে ভোট পূর্ববর্তী সময়ে জনমানসে প্রভাব ফেলতে এর জুড়ি মেলা ভার। ফলে পুরুলিয়ায় ২০১৯-এর “পুনরাবৃত্তি” না কি এবার অন্য কোন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের “ইঙ্গিত” তা জানতে অপেক্ষা অবশ্যই ৪ ঠা জুনের।

শেয়ার করুন

You cannot copy content of this page