কিরীটি মাহাত
২৫ আগস্ট , ২০২০
পশ্চিম সীমান্ত বাংলা তথা বৃহত্তর রাঢ়-ঝাড়খন্ড ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লোক উৎসব হলো জাওয়া বা করম। ভাদ্রমাসের পার্শ্ব একাদশী তিথির সাতদিন পূর্বে বালিভর্তি ডালাতে বীজ বপনের মধ্যে দিয়ে ওই উৎসবের সূচনা। তারপর পার্শ্ব একাদশী তিথিতে আখড়াতে করমডাল পুঁতে করম দেবতার পূজা আরাধনা এবং পরদিন ইঁদ বা সূর্যদেবতার উদ্দেশ্যে শষ্য চারাগুলি উৎসর্গের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি।
লক্ষ্য করার বিষয় জাওয়া বা করমের মতই এই অঞ্চলের লোক সাংস্কৃতির অধিকাংশ লোকাচার বা লোক উৎসবগুলিই হলো কৃষি আচার বা অনুষ্ঠান ভিত্তিক এবং তার বেশিরভাগই আবার মেয়েদের উৎসব। ১লা মাঘ থেকে কৃষি বৎসরের সূচনা। আখানে হল কর্ষণের সূচনা, রহিন বীজ ফেলার উৎসব। রহিনের পর সাতদিন, এক একদিন এক এক ধরনের বীজ ফেলার নিয়ম বা রীতি। আষাঢ়ের শুরুতেই গরাম জাঁতালপূজা। আশ্বিন সাঁকরাইতে গমহা, শষ্য চারাকে জাগানো। কার্তিক অমাবস্যায় পাঁচদিন ব্যাপী সহরই বাঁদনা বা গো বন্দনা উৎসব। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে শষ্যদেবী ডিনির সঙ্গে ধান শিস দিয়ে টুসু থাপনা। সারা পৌষ মাস জুড়ে যার আরাধনা বন্দনার পর সংক্রান্তিতে টুসু বা মকর উৎসব। মোটামুটি এইগুলিই হলো প্রধান প্রধান কৃষি আচার অনুষ্ঠান বা এই অঞ্চলের কৃষি উৎসবগুলির বার্ষিক বৃত্ত। লক্ষ্যণীয় বিষয় এইগুলির অধিকাংশই হলো একান্তভাবেই মেয়েদের নিজস্ব।
মেয়েরাই এইগুলির স্রষ্টা, আয়োজক, ধারক এবং বাহক ও স্বভাবতই মেয়েদের ভূমিকা ও উপস্থিতির প্রাধান্য থাকায় উৎসবগুলি মুখরিত হয়ে ওঠে নাচে, গানে, সাজে, সজ্জায়, আনন্দে, অলঙ্করণে। তবে মেনে নিতেই হয় ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশী তিথিতে জাওয়া বা করম উৎসবের তাৎপর্য অন্য এক সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের দাবী রাখে।
জাওয়া শব্দটির অর্থই হলো Germination বা বীজ থেকে অঙ্কুর উদ্গম। বালি ভর্তি ডালা বা টুকিতে নানা শষ্য বীজ পুঁতে চারা অঙ্কুরিত করে ছোট ছোট কুমারী মেয়েরা। এইটি উৎসবের অন্যতম প্রধান আচার বা অনুষ্ঠান। করম ঠাকুরের প্রতীক করমডাল এবং পরদিন ইঁদ বা সূর্যদেবতাকে তা উৎসর্গ উৎসবটি অসামান্য ইতিহাস ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বহন করে। আমার মনে হয়েছে ছোট ছোট কুমারী মেয়েদের শষ্য অঙ্কুরোদ্গমের খেলা বা তুচ্ছ লোকাচার হিসেবে এটিকে ভাবার কোন কারণ নেই। অন্তর্নিহীত তাৎপর্যে অতীত ইতিহাসের একটি প্রতীকি ঘটনা হিসেবে এটি প্রতিভাত হয়। কারণ সমাজবিজ্ঞানীগণ মেনে নিয়েছেন এখন থেকে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার বৎসর পূর্বে মেয়েরাই কোন একদিন কৃষিআবিস্কার করেছিল অর্থাৎকৃষি আবিস্কার করেছিল নারী এইমতটি আজ সর্বজন স্বীকৃত। যারমধ্য দিয়ে মানুষ অরণ্য থেকে কৃষিসভ্যতায় উত্তোরণ করেছিল। কৃষির আবিস্কার তথা কৃষি সভ্যতার পত্তনের পীঠস্থান হিসেবে সমাজ বিজ্ঞানীগণ টাইগ্রীস, ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকা অঞ্চলটিকেইনির্দেশ করে থাকেন। কেবলমাত্র তাইনয় খাদ্য উৎপাদন পর্বেসূচনা লগ্নের এই অঞ্চলটি সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়, মেহেরগড় কিলিগুলু, গুমলা সহ সিন্ধু-সরস্বতীর মেলুহা দেশেও তা ব্যপ্ত ছিল। ‘এনসিয়েন্ট সোসাইটির লেখক লুইস হেনরি মগানের মতে, “ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায়, ভারতে এবং এশিয়ার স্টেপ অঞ্চল সমূহে পশুকে পোষ মানানোর ফলে নতুন ধরনের জীবনযাত্রা শুরুহয়”। অধ্যাপক জোনাথন মার্ক কেনোয়ার আরও সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে বলেছেন, ‘খ্রীষ্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দ নাগাদ প্লাস্টোসিন যুগের শেষে এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই জাতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তর শুরু হয়েছিল। পশ্চিম এশিয়ার মিশরের উত্তরাংশ থেকে মেসোপটেমিয়া এবং আফগানিস্তান থেকে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত। এই কৃষিকেন্দ্রীক সভ্যতা সাংস্কৃতির স্রষ্টা এবং ধারক বাহক কারা তা আজও রহস্যে ঢাকা, ইতিহাসও এখানে নীরব”। ইতিহাস যেখানে নীরব সেখানে সরব লোকসাংস্কৃতি, লোক স্মৃতি, লোকশ্রুতি, লোকাচার, অনুষ্ঠান এবং উৎসবগুলি। হাজার হাজার বছর প্রাচীন এই লোক ঐতিহ্য ও পরম্পরাগুলি এই অতীত ইতিহাসের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
মানব সভ্যতার সেই যুগান্তকারী ঘটনাকে মানুষ একেবারেই বিস্মৃত হবে, এই কথা ভাবা যায় না। ভুলেও যায়নি তারা। তাদের মত করেই একান্ত আন্তরিকতায় সেই দিনটি তারা আজও স্মরণে মননে, আনন্দে, উচ্ছাসে পালন করে চলেছে। প্রশ্ন ছিল এই অসামান্য কৃতিত্ব কার বা কাদের? মতভেদ থাকলেও পণ্ডিত রাহুল সাংস্কৃত্যায়ণের মতে দামিল জাতির মানুষেরাই এই কৃতিত্বের অধিকারী। হ্যাঁ, এই দ্রাবিড় বা দামিল জাতির অন্যতম প্রাচীন জনগোষ্ঠী কুড়মি জাতির মানুষেরাই আজও এই উৎসব ও অনুষ্ঠানকে পালন করে চলেছে। অবশ্যই তার সঙ্গে খেরওয়াড়া সম্প্রদায়ের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষেরাও।
দশ হাজার বছর প্রাচীন এই যুগান্তকারী ঘটনা এবং তার ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক স্মৃতি বিজড়িত ক্রুমনদী, কুড়ম অঞ্চল, কুড়ুম পাহাড়, হারাতা পাহাড়, সপ্তসিন্ধু, হড়দিপি মগরীব স্মৃতি ও বিবরণ জাওয়া বা করম গীতে আজও গাওয়া হয়। আজও পাওয়া যায় সেই অঞ্চলের কৃষির কথাও। তাই বলা যায় স্মৃতিতে, স্মরণে, মননে জাওয়া উৎসব দশ হাজার বছর প্রাচীন সেই ঘটনারই প্রতীকরূপ, মানব সভ্যতারও শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় দিন।
মানব সভ্যতার বিকাশ ও উত্তোরণ নিঃসন্দেহে আজ গর্বের কিন্তু কৃষি ছাড়াও সভ্যতা তো অচল।তাই বিশ্বনারী দিবস, মে দিবস, ভাষা দিবস, আদিবাসী দিবস তথা যোগ দিবসের মতো এই দিনটিকে বিশ্ব কৃষি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিলে মানব সভ্যতাকেই মর্যাদা দেওয়া হবে। গীতেই বলা হয়েছেঃ – এতিক এতিক জাওয়া কি আ কি আ জাওয়া জাওলম ভাইরে ধনবিরুআ অথাৎ এত এত জাওয়া ডালিতে কি কি বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে? উত্তরে বোন ভাইকে বলছে অনেক অনেক ব্রীহি বা দান বীজ আমি এতে অঙ্কুরিত করেছি। বোনের সেই যুগান্তকারি আবিস্কারকে কি আমরা আজ মান্যতা দিতে পারি না?
শেয়ার করুন