নিজস্ব সংবাদদাতা , পুরুলিয়া
২৫ আগস্ট , ২০২০
বাবুগিরি দূরে ঠেলে ভাই-বন্ধু সবাই মিলে… অরণ্য সম্পদ রক্ষা করে যাই”, ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অযোধ্যা পাহাড়ে বসে অরণ্য সম্পদ রক্ষা করার ডাক দিয়ে গান লিখে ৩০ বছরের তরুণের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ঝুমুর ও লোকগানের জগতে। তারপর দীর্ঘ ৩৫ বছর পেরিয়ে এখন তিনি ৬৫ বছরের বৃদ্ধ হলেও মন ও শরীরের দিক থেকে এতটাই জোয়ান যে এখনো তিনি বলেন, ” তেমন সুযোগ পেলে অরণ্য সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি”।
বাগমুন্ডি ব্লকের মাঠা গ্রাম পঞ্চায়েতের খুদুডি গ্রামের বাসিন্দা সুষেন মাহাতোর ঝুমুর ও লোকগানের আসরে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল অরণ্য সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে। ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাগমুন্ডি এলাকার জঙ্গল দেখে অরণ্য সম্পদ রক্ষা করার গভীর তাড়নায় হাজার ১৯৮৫ সালে একটি বেসরকারি সমাজসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন সুষেন মাহাতো। এলাকার বেশ কিছু মানুষকে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে পেয়ে জোর আন্দোলনে নেমে পড়েন জঙ্গল ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে। সে সময়েই অযোধ্যা পাহাড়ে বসে এই আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে জঙ্গল বাঁচাতে মানুষকে আহ্বান ক’রে ঝুমুর অঙ্গের বেশ কিছু গান রচনা করে ফেলেন সুষেন বাবু। এই ভাবেই লোকগানের দিকে তাঁর পথ চলা শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে এই দীর্ঘ ৩৫ বছরে ঝুমুর, টুসু, আঞ্চলিক লোকগীতি ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকের এবং বিভিন্ন ধরনের গান লিখেছেন এবং তাদের সুরও করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, গান ছাড়াও লেখেন কবিতাও। তাঁর সমস্ত রচনাই পারিপার্শ্বিক সামাজিক বিষয়বস্তুকে ঘিরেই। কখনো সমাজের কোনো অনিয়ম-বেনিয়ম বা অসামাজিক কাজকর্ম দেখলেই তার বিরুদ্ধে কলম ধরে গান কিংবা কবিতা লিখে ফেলা সুষেন বাবুর স্বভাবজাত। আবার কোন বিশেষ সামাজিক প্রকল্প বা কর্মসূচি যদি তাঁকে প্রভাবিত বা অনুপ্রাণিত করে তবে তার সুফলের দিকটি নিয়েও লিখে ফেলেন কবিতা কিংবা গান। এরকম ভাবেই কন্যাশ্রী নিয়ে তিনি লিখে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি কবিতা। কন্যাশ্রী প্রকল্প বিশ্বশ্রী খেতাব পেয়েছে। তাতে সুষেন বাবুর বক্তব্য, “সত্যিই কন্যাশ্রী প্রকল্প সমাজে একটা বিরাট পরিবর্তন আনতে সক্ষম”। পাওয়ার লেখা বেশ কয়েকটি যাত্রাপালা এলাকার যাত্রাদল বহুবার মঞ্চস্থও করেছে। এমনকি তাতে পুরস্কারও জিতেছে যাত্রাদল।
সুষেন বাবুর কথায়, ” একসময় গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্রপূর্ণ এক সহাবস্থান। কিন্তু বিগত বেশ কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক দলবাজি এবং কিছু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মানুষের কারণে মানুষে মানুষে যেন একটা বিভেদ তৈরি হয়ে গেছে”। যা শিল্পী মনে পীড়া দিয়েছে অশেষ। ব্যাথিত হৃদয়ে সুষেনবাবু তাই লিখে ফেলেছেন ঝুমুর গান, “সব পার্টিরই শহরে ঘাঁটি/পার্টি করে গাঁ হল মাটি/বল, এ দুনিয়ায় কে খাঁটি”।
পেশা বলতে নিজের গ্রামের বাড়ি থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাঘমুন্ডি সদরে এসে গানের ছাত্রছাত্রীদের টিউশন দেওয়া। তাতে মাস পুরোলে হাজার দুই-আড়াই রোজগার হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে মনের দিক থেকে পূর্ণমাত্রায় শিল্পী সুষেন বাবু বলেন, ” অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা পয়সা দিতে পারে না, আমি তাদের বিনা পয়সাতেই গান শেখাই তাদের আগ্রহ দেখে”। তবে আর্থিক অবস্থায় একটা সুরাহা হয়েছে ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে। জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধীনে রাজ্য সরকারের শিল্পী ভাতা প্রকল্পের আওতাভুক্ত হওয়ায় ওই সময় থেকে সুষেন মাহাতো মাসিক এক হাজার টাকা শিল্পী ভাতা পাচ্ছেন। ২০১৫ সালে রাজ্য সরকার তাঁকে শিল্পী ভাতার জন্য মর্যাদা দিলেও, ব্যাঙ্ক একাউন্টে গোলযোগের কারনে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভাতা পাননি। সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করেও আজও জোটেনি সেই বকেয়া, কিছুটা অভিমান আর আক্ষেপের সুরেই জানালেন পুরুলিয়ার প্রখ্যাত সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ তথা সংগীত শিক্ষক শ্যাম মাহাতোর কাছে ৭ বছর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেওয়া সুষেন মাহাত।
গান এবং সুর তাঁর কাছে যেমন প্রিয়, একইভাবে আজও অরণ্য সম্পদ এবং জঙ্গল তাঁর ভালোবাসার পাত্র। তাই প্রতিদিন পেশাগত কারনে প্রায় ৩২ কিমি সাইকেল চালানো ৬৫ বছরের জোয়ান সুষেন বাবুর বক্তব্য, “৮০-র দশকের মাঝামাঝি জঙ্গল সম্পদ রক্ষার যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেটা কালক্রমে আর্থিক পরিস্থিতি এবং তৎকালীন বনদপ্তরের চূড়ান্ত অসহযোগিতার কারণে বন্ধ হয়ে গেলেও, আজও যদি তেমন কোন অরণ্য সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পাই, তাহলে আবার একইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বো”। আজও সেই আশাতেই তিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও জঙ্গলকে ভালোবাসার গানের সুর ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। জানালেন, ” পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও যাতে অরণ্য সম্পদ রক্ষার ভাবনাটি চিরস্থায়ী থাকে, সেই প্রচেষ্টাটুকু করে যাই”।
শেয়ার করুন