নিজস্ব সংবাদদাতা , পুরুলিয়া
২ সেপ্টেম্বর , ২০২০
জেলা তৃণমূলের একাংশের আশঙ্কা ছিলই। সেই আশঙ্কাকেই সত্যি করে বুধবার জয়পুর ব্লক তৃণমূলে দ্বন্দ্ব চরমে উঠলো। জয়পুর পঞ্চায়েত সমিতির ৬ জন নির্বাচিত সদস্য জেলা তৃণমূলের নব নির্বাচিত সভাপতি গুরুপদ টুডুকে নিজেদের স্বাক্ষর সম্বলিত চিঠি দিয়ে কীর্তন মাহাতকে ব্লকের দলীয় সভাপতি করার দাবি জানিয়ে দিলেন। এমনকি কীর্তন মাহাতকে ব্লকে দলীয় সভাপতি না করলে তাঁরা “বিকল্প পথ” খুঁজবেন বলেও জানান। তবে কি সেই “বিকল্প পথ” তা খোলসা করে কেউই বলতে চাননি।
এদিকে দলীয় সভাপতিকে লেখা দাবি পত্রের শুুরুতে জয়পুর পঞ্চায়েত সমিতির ১১ জন নির্বাচিত সদস্যের পক্ষে এই দাবিপত্র বলে উল্লেখ থাকলেও স্বাক্ষর কেবলমাত্র ৬ জনের কেন ? তাহলে অন্য ৫ সদস্য কি চিঠির সঙ্গে সহমত নন? এই প্রশ্নেরও কোন সদুত্তর কারোর কাছেই পাওয়া যায় নি। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সমিতির নির্বাচিত সদস্য ফকির চন্দ্র গোস্বামী ও অজিত মাহাতর বক্তব্য, ব্লকে দল অভিভাবকহীন, পূর্বতন জেলা কমিটিকে বারবার বলা সত্ত্বেও বিগত দুবছর ধরে ব্লকের সভাপতি নির্বাচন হয়নি। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সিপিএম থেকে তৃণমূলে যোগদানকারী পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচিত সদস্য বৈকুন্ঠ কুমারেরও একই কথা। তাঁরা দাবি করেছেন “কীর্তন মাহাত এই ব্লকে দলের জন্মদাতা, আমাদের প্রত্যেকের এলাকার দলীয় নীচুতলার কর্মীরা তাঁকেই সভাপতি হিসেবে চাইছেন। দলে যোগদানকারী নতুন কেউ সভাপতি নির্বাচিত হলে সকলের মনোবল ভেঙ্গে যাবে”।
প্রসঙ্গত তিনদিন আগে বিজেপির শঙ্কর নারায়ণ সিং দেও ও কংগ্রেসের চঞ্চল মৈত্র তৃণমূলে যোগদান করেন। দলের অন্দরের খবর এঁদের মধ্যে থেকেই একজনকে ব্লকের দলীয় সভাপতি করার বিষয়ে জেলা নেতৃত্বের নাকি চিন্তা ভাবনা। এরকম হলে যে জয়পুরে দলের মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে, এরকম আশঙ্কা আগেই করছিলেন দলেরই একাংশ। সেই আশঙ্কাকেই সত্যি করে বুধবার জয়পুরে বেঁকে বসেছেন সমিতির নির্বাচিত দলীয় সদস্যরা। ব্লকে দলীয় সভাপতি না থাকায় পঞ্চায়েত সমিতির কোন কাজই হচ্ছে না বলেও তাঁরা দাবি করেছেন বটে, তবে দলের ব্লক সভাপতির সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির কাজের সম্পর্কটা কি? তার কোন সদুত্তর নেই স্বাক্ষরকারীদের কাছে।
জয়পুর ব্লকে কীর্তন-শক্তিপদর তরজা নতুন নয়। এই তরজার কারনে বিগত দুবছরের অধিক সময় ধরে ব্লকে দলীয় সভাপতিই নির্বাচন করে উঠতে পারেনি তৃণমূলের জেলা নেতৃত্ব। দলের এক ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত মাসে ব্লক সভাপতিদের নাম ঠিক করার বৈঠকে তৃণমূলের এক কো-অর্ডিনেটর সভাপতি হিসেবে কীর্তনের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে বললে তীব্র বিরোধ করেছিলেন বিধায়ক শক্তি পদ মাহাত। জয়পুর শাখার এক ঘনিষ্ঠ কর্মীর দাবি, “ব্লকে অভিভাবকহীনতা এবং দলের অন্দরের তরজার খেসারত বিগত পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে দিতে হয়েছে আমাদের”।
২০১৮-র ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে ব্লকের মোট ৯০টি পঞ্চায়েতের মধ্যে শাসক তৃণমূল পায় মাত্র ২৪টি আসন, যেখানে বিজেপির ঝুলিতে গেছিল ৪৫টি আসন। মোট ২১টি সমিতির আসনে বিজেপি জোর টক্কর দেয়। তৃণমূল ও বিজেপি উভয়েরই পালে আসে ৯টি করে সমিতি। বাকি তিনটি কংগ্রেস, বাম ও নির্দলরা ১টি করে ভাগ করে নেয়। জেলা পরিষদের ১৬ নম্বর আসনটিতে তৃণমূলের মেঘদূত মাহাত জয়ী হলেও ব্লকের ১৭ নম্বর জেড পি আসনটি (ওবিসি মহিলা) শাসক দলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় বিজেপি।
২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে জয়পুর বিধানসভা ক্ষেত্রটিতে বিরোধী বিজেপি তৃণমূলকে ৩১৭৪৪ ভোটে (তৃণমূল-৫৬৩৪৩, বিজেপি-৮৮০৮৭) পরাজিত করে। “এই চরম বিপর্যয়ের পরেও ব্লকে দলীয় কোন্দল মেটাতে পারেনি জেলা নেতৃত্ব” বলছেন দলেরই কেউ কেউ। তাদের আশঙ্কা ২০১১-র দুঃস্বপ্ন। তাঁরা বলছেন, “জয়পুরে দলের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এমনই যে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ‘গোঁজ প্রার্থী’ শক্তিপদ মাহাত এর অর্ধেক ভোটও পাননি কীর্তন মাহাত ,তৃণমূল – কংগ্রেস জোট প্রার্থী হয়েও । শক্তিপদ মাহাতর সাথে তাঁর সাথে ব্যবধান ছিল প্রায় ২৭ হাজার । দুজনের দ্বন্দ্বে বামফ্রন্ট প্রার্থী জয়পুর আসনে জয়লাভ করেন “।
দেখুন ভিডিও
