দিলীপ কুমার গােস্বামী
শিক্ষাবিদ, মানভূম গবেষক
মানভূমের স্বাধীনতা আন্দোলনের কাহিনী সাধারণ মানুষের মধ্যে বহুল প্রচার পায়নি। ১৯৪২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর মেদনীপুরে ভারত ছাড়াে আন্দোলনে মাতঙ্গিনী হাজরা শহীদ হয়েছিলেন।একথা পুরুলিয়ার সাধারণ মানুষও জানেন।কিন্তু তার একদিন পরে, অর্থাৎ ৩০শে সেপ্টেম্বর ১৯৪২ মানবাজার থানা ঘেরাও করতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে চুনারাম মাহাত ও গােবিন্দ মাহাত দুজন আঠারাে বৎসরের কৈশাের উত্তীর্ণ কংগ্রেস কর্মী শহীদ হয়েছিলেন, একথা অনেকেই জানেন না। শহীদদের মহান আত্মবলিদান আমাদের সততস্মরণ করা কর্তব্য। কারণ বর্তমান প্রজন্ম তাদের উত্তরাধীকারিত্ব বহন করছি। পুরুলিয়া জেলায় স্বাধীনতা আন্দোলনের সরকার স্বীকৃত শহীদ আছেন ১৩ জন। জেলার বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথা সমাজকর্মী, জেলার বহু শিক্ষিত মানুষের অনেকের কাছেই এই তথ্য অজানা। জেলার ইতিহাস চর্চার এই ঘাটতি অত্যন্তপীড়াদায়ক।
১৯৪২-এর ভারত ছাড়াে আন্দোলনে মানভূম জেলায় শহীদ হয়েছিলেন ৬জন।তাঁদের মধ্যে মানবাজার (অবিভক্ত) থানার শহীদের সংখ্যা ছিল ৪ জন। আমরা ভারতছাড়াে আন্দোলনের ৬জন শহীদের নাম, পিতার নাম, গ্রামের নামগুলি পর পর সাজিয়ে দিচ্ছি।
আজকের আলােচনার সূচীমুখ হল ভারত ছাড়াে আন্দোলনের শহীদ চুনারাম মাহাত ও গােবিন্দ মাহাতর স্মৃতিতে মূর্তি স্থাপনের অতি উল্লেখযােগ্য ঘটনাটি। শহীদের মহান আত্মদানের কথা জেলাবাসী ভােলেননি, শহীদরা জেলাবাসীর আত্মার আত্মীয়। আত্মদানের ৭৮ বৎসর পর এই মূর্তি স্থাপনের ঘটনায় তা প্রমাণিত হল। শহীদদের প্রণাম।
উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন, কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারত ছাড়াে আন্দোলনের ৬ জন শহীদের নামের তালিকা লিপিবদ্ধ করছি।
১। চুনারাম মাহাত, পিতা -বালহান মাহাত, গ্রাম-কুদা, থানা-মানবাজার, জেলা-পুরুলিয়া (৩/২/১৯২৪)।
২। গােবিন্দ মাহাত, পিতা-বিশ্বনাথ মাহাত, গ্রাম-নাথুরডি, থানা-মানবাজার, জেলা-পুরুলিয়া (৭/৭/১৯২৪)।
৩। মুকুন্দ মাহাত, পিতা-মিলন মাহাত, গ্রাম-খােলাহারা, থানা-মানবাজার, জেলা-পুরুলিয়া। ৪। মহাদেব শবর, পিতা – খুদু শবর, গ্রাম-খােলাহারা, থানা-মানবাজার, জেলা-পুরুলিয়া। (ভারতছাড়াে আন্দোলনে যােগ দিয়ে পাটনা ডিভিশন ক্যাম্পে দুজন প্রয়াত হন)।
৫। সতীশ চন্দ্র মাইতি, পিতা-কেদারনাথ মাইতি, গ্রাম-কোটা, জেলা-পুরুলিয়া (১০ই নভেম্বর ১৯৪২ পুলিশের গুলিতে প্রয়াত)।
৬। জগদীশচন্দ্র পারিয়া, গ্রাম-বিরুনাবাড়ী, জেলা-মেদিনীপুর। ভারত ছাড়াে আন্দোলনে যােগ দিয়ে পুরুলিয়ায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পুলিশ আমলা বাদে তাঁকে অন্তরীন করে রাখেন। দীর্ঘ রােগভােগের পর ১১ নভেম্বর ১৯৪৪ শহীদের মৃত্যুবরণ করেন।
মানভূমের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস অতি গৌরবােজ্জ্বল। ১৭৬৭ সালে চুয়াড় বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। শেষ হয়েছিল ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে। ৬৬ বৎসর ধরে চলা চুয়াড় বিদ্রোহ দেশের প্রথম কৃষক বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালে সংগঠিত সিপাহী বিদ্রোহ পঞ্চকোটের মহারাজা নীলমণি সিংদেও এবং জনজাতিদের অংশগ্রহণে বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড বিরােধী আন্দোলন-বিক্ষোভ, অসহযােগ আন্দোলন (১৯২১), সাইমন কমিশন বিরােধী আন্দোলন (১৯২৮-২৯), আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩২-৩৩) এবং ১৯৪২ সালের ভারতছাড়েআন্দোলন মানভূমে যে উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছিল, তা দেশের যে কোন জেলার সাথেই তুলনীয়। বিশেষত বরাবাজার, বান্দোয়ান,মানবাজার, পটমদার ভারতচ্ছাড়াে আন্দোলনের তুলনা সারা দেশের মধ্যেই ব্যতিক্রম।
১৯৪২ সালে ৮ই আগস্ট ভারতছাড়াে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বােম্বাইয়ে, অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির বৈঠকে। ৯ই আগস্ট ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করে। ১০ই আগস্টপুরুলিয়া শহরের তেলকলপাড়া। আশ্রমে পুলিশ এসে লাবণ্যপ্রভা দেবী, শ্রীশ ব্যানার্জী, বৈদ্যনাথ দত্ত, অরুণ চন্দ্র ঘােষ, রামকিংকর মাহাত, কমলা ঘােষকে গ্রেপ্তার করে জেলখানায় পাঠায়। শিল্পাশ্রম সহ কংগ্রেসের সমস্ত অফিস বাজেয়াপ্ত করা হয়। একে একে বীররাঘব আচারিয়া, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত, পূর্ণেন্দু মুখােপাধ্যায়, অন্নদাপ্রসাদ চক্রবর্তী এবং অতুল চন্দ্র ঘােষ (১৩ ই সেপ্টেম্বর) কে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জেলা কংগ্রেসের প্রথমসারির নেতৃত্বের সবাই জেলে গেলেন। নেতৃত্ব দেওয়ার কেউ থাকল না। কংগ্রেসের দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব জেলায় ভারত ছাড়াে আন্দোলন সফল করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। মিটিং হল প্রথমে আদ্রায়, পরে গিড়গিড়িতে, পুনুড়াগ্রামে, সব শেষে বান্দোয়ান থানার জিতান গ্রামে।প্রতিটি মিটিং-ই হয়েছিল অত্যন্ত গােপনীয়তায়। ২৩ শে সেপ্টেম্বর গভীর রাত্রে (১২টা/ ১টা) অতি গােপনে জিতান গ্রামের চুনারাম মাহাতর (ভজহরিবাবুর পিতা) বাড়ীতে খাওয়া দাওয়ার পর মিটিং শুরু হয়েছিল। মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল –
১। ২৯শে সেপ্টেম্বর ১৯৪২, ১৩ই আশ্বিন মঙ্গলবার পুরুলিয়া থেকে সমস্ত থানার যােগাযােগ বন্ধ করে দিতে হবে।টেলিগ্রাফের/টেলিফোনের তার কেটে, রাস্তার পুল ভেঙে যােগাযােগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে দিতে হবে।
২। ২৯শে সেপ্টেম্বর রাত ৩টা/ ৪টায় থানা দখল করে পুলিশদের বেঁধে রাখতে হবে। থানার সমস্ত রেকর্ডপত্র ও সরকারী কাগজপত্র, মদভাটি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে হবে।
৩। এই সকল কাজ নিজ নিজ থানার কর্মীরা করবেন। ১লা অক্টোবর ১৯৪২ সকল কর্মীকে পুরুলিয়া কোর্ট-কাছারিতে সত্যাগ্রহ করে সরকারী কাজ বন্ধ করে দিতে হবে।
স্মরণে রাখতে হবে ১৯৪২-এর ভারতছাড়াে আন্দোলন মানভূমের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বপ্রধান সফল কর্মসূচী। এই কর্মসূচী সফল করতে এগিয়ে এসেছিলেন কংগ্রেসের দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব। জেলে বন্দী প্রথমসারির কংগ্রেস নেতৃত্ব বান্দোয়ান, বরাবাজার, মানবাজার, পটমদা, রঘুনাথপুরের সফল আন্দোলনের খবর শুনে বলেছিলেন, “তােমরা আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছাে”।
যে কর্মী-নেতৃত্বরা ১৯৪২-এর আন্দোলনের জন্য জিতান গ্রামে বৈঠক করেছিলেন তাদের নামগুলি তুলে দিলাম কৃষ্ণপ্রসাদ চৌধুরী (লক্ষ্মণপুর), জগবন্ধু ভট্টাচার্য (মতনপুর), সত্যকিংঙ্কর মাহাত (মেট্যালা) গিরীশচন্দ্র মাহাত (মেটালা), চুনারাম মাহাত (নাথুরডি), মােহিনী মাহাত (পিটিদিরি), আঘনী মাহাত (ঐ), মথন চন্দ্র মাহাত(হেরবনা-বরাবাজার), ভীমচন্দ্র মাহাত (হিজলা-বরাবাজার), অমরচন্দ্র দত্ত (মাচা, পটমদা), অমলচন্দ্র ঘােষ (শিল্পাশ্রম), চিত্তভূষণ দাশগুপ্ত (মাঝিহিড়া), কুশধ্বজ মাহাত (মধুপুর বান্দোয়ান), রােহিনী মুদি(বান্দোয়ান, ভালু), গৌর মাহাত (ভালু, বান্দোয়ান), ভজহরি মাহাত (জিতান, বান্দোয়ান),চুনারাম মাহাত (জিতান, বান্দোয়ান), বিষ্ণু মাহাত (আঁকরাে)। ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৪২ ভােরে জিতান গ্রামের বৈঠক শেষ হল। বৈঠকে উপস্থিত কর্মী নেতৃত্ব ২৯শে সেপ্টেম্বরের আন্দোলন সফলার জন্য গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে
পড়েন।
(শেষাংশ পরবর্তী সংখ্যায়)
শেয়ার করুন