দিলীপ কুমার গােস্বামী, শিক্ষাবিদ, মানভূম গবেষক
মানভূমের স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে সফল আন্দোলন ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়াে আন্দোলন। মানবাজার থানার সত্যকিংকর মাহাত, গিরীশ চন্দ্র মাহাত, মােহিনী মাহাতও আঘনী মাহাত এই চারজন জিতান বৈঠকে হাজির ছিলেন। জিতান’ বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলি তাঁরা কর্মীদের কাছে গােপন রেখেছিলেন। শুধু বলেছিলেন “তােমরা প্রস্তুত থেকো, সঠিক সময় সংবাদ দিয়ে কাজে যােগ দিতে বলা হবে।
সঠিকসময় কোনটি ? জিতান বৈঠকের সিদ্ধান্ত ছিল, ২৯শে সেপ্টেম্বর রাত ৩টা/৪টার সময় জেলার সমস্ত থানা আক্রমণ করে পুলিশের বন্ধুক কেড়ে নিতে হবে, কাগজপত্র জ্বালিয়ে দিতে হবে। পরদিন অর্থাৎ ৩০শে সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা/১০টার মধ্যে পুরুলিয়া কাছারিতে সত্যাগ্রহ করে সরকারী কাজ বন্ধ করে দিতে হবে। অতএব ২৯শে সেপ্টেম্বর রাতটিই হল সঠিক সময়।
বােরাে এলাকার মােহিনী মাহাত ও আঘনী মাহাত জিতান বৈঠকে হাজির ছিলেন। জিতান বৈঠক শেষ করে তাঁরা আঁকরাে গ্রামে আসেন। বিষ্ণু ও হেমচন্দ্র মাহাতকে ডেকে তাঁরা বলেন জিতান বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বােরাের মদভাটি ও খড়িদুয়ারার চৌকিদারী অফিস পােড়াতে হবে। ২৮ তারিখে কর্মীরা সকলে ধরমপুর স্কুলে সমবেত হলেন। স্কুলের চারিদিকের ঝােপজঙ্গলে আত্মগােপন করে থাকেন। কর্মীদের জল খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ডাঙ্গরডি, ধরমপুর, পিটিদিরি, তামাখুনের কর্মীরা এবং বােরাের শবর পাড়ার কর্মীরা জড়াে হন। সকলে মদভাটির দিকে রওনা হন। মদভাটির গােদামে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। মদভাটি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এরপর সকলে গাঁজার দোকানে পৌঁছে দোকানের সব গাঁজা বের করে আগুনে পুড়িয়ে দিলেন। শুরু হল প্রবল বর্ষণ। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সকলে খড়িদুয়ারা এলেন। এই গ্রামের একটিবাড়ীতে চৌকিদার-তহশীলদার থাকতেন। দরজা ভেঙে সমস্ত কাগজপত্র বার করে পুড়িয়ে দেওয়া হল। এইকর্মসূচী হয়েছিল ২৮শে সেপ্টেম্বর, ১২ই আশ্বিন রাত্রে।
২৯শের শেষ রাত্রে ৩টা/৪টায় থানা আক্রমণ করার কথা। এই ৩৬ ঘন্টা কর্মীরা থাকবেন
কোথায়, খাবেন কি ? বিপ্লবী কর্মসূচীতে এই ত্রুটি মারাত্মক। নেতারা চেপুয়া গ্রামে গিয়ে
সত্যকিংকর মাহাতর কাছে ঘটনাটি রিপাের্ট করলেন। সত্যকিংকবাবু সমস্ত কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। ২৯ শে সেপ্টেম্বর সারাদিন কর্মীরা বিভিন্ন জনের বাড়ীতে আত্মগােপন করে থাকলেন। ২৯শে সেপ্টেম্বর রাত্রে সকলকে চেপুয়ার মাঠে সমবেত করা হল। ভােরেই মানবাজার থানা আক্রমণ করা হবে। কর্মীরা সকলে মানবাজারের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। দলপতি সত্যকিংকর মাহাত। গােপালপুর গ্রামের পুকুরের ধারে কর্মীরা জলখাবার খেলেন। দ্রুত হাঁটছিলেন সকলে, সেজন্য সত্যকিংকরবাবু পিছিয়ে পড়ছিলেন। সত্যাগ্রহীদের সকলের আগে ছিলেন গােবিন্দ মাহাত (শহীদ), চুনারাম মাহাত (শহীদ) ও গিরীশ মাহাত। দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন হেমচন্দ্রমাহাত, বিষ্ণুপদ মাহাত।
থানায় পৌঁছাতেই দেখা গেল দারােগা ভগবান সহায় পুলিশ কর্মীদের নিয়ে রাইফেল হাতে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছেন। হাসপাতালের ডাক্তার অন্নদা চক্রবর্তীও তাঁদের সাথে ছিলেন। দারােগা হুমকি দিলেন, সত্যাগ্রহীরা সরে না গেলে গুলি চালাব। সত্যাগ্রহীরা সকলে থানায় প্রবেশ করতে গেলে পুলিশ গুলি চালাল, গুলির আঘাতে গােবিন্দ মাহাত, চুনারাম মাহাত ও গিরীশ মাহাত থানা প্রাঙ্গণে পড়ে গেলেন। হেমচন্দ্র মাহাত ও বিষ্ণুপদমাহাত গুরুতর আহত হন। থানা প্রাঙ্গণ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। গ্রামের মানুষ উত্তেজিত হয়ে থানায় ইট পাটকেল ছুড়তে থাকেন। এ সময় সত্যকিংকর বাবু সামনে এসে দাঁড়ালেন। নেতাকে দেখে সত্যাগ্রহীরা সমস্বরে ধ্বনি দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি হিংস্রতার দিকে গড়াচ্ছিল দেখে সত্যকিংকরবাবু সত্যাগ্রহ বন্ধ করে দিলেন। গুলিতে আহতদের সত্যকিংকরবাবু জল দিতে গেলে পুলিশ গুলি চালাবার হুমকি দেয়। হুমকি অগ্রাহ্য করে সত্যকিংকরবাবু সামনে গিয়ে দেখলেন চুনারাম মাহাত মৃত। গােবিন্দমাহাত গুরুতর আহত, গিরীশ মাহাত উত্থান শক্তি রহিত। গােবিন্দ মাহাতকে পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘােষণা করেন। গিরীশ মাহাতর দুটি পা গুরুতর জখম হয় – সারাজীবনের মত তিনি প্রতিবন্ধী হয়ে যান। হেমচন্দ্র মাহাতর পিঠে গুলি লাগে – পুলিশ আহতদের সকলকে অ্যারেস্ট করছিল বলে অনেকে আত্মগােপন করেন। কিছুদিন পর নেতৃত্বের নির্দেশে তাঁরা আত্মসমর্পণ করেন। সকলকে পুরুলিয়া জেল, পরে ভাগলপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়। সাজাপ্রাপ্তরা ১৯৪৪ সাল থেকে ছাড়া পেতে থাকেন।১৯৪৬ সালে সবাই ছাড়া পান। মানবাজারে পুলিশের গুলিতে ৩০/৩৫ জন সত্যাগ্রহী আহত হন। মানবাজারে বিজা দত্ত আহতদের সেবা সুশ্রুষা করছিলেন। সরকার চিকিৎসকও আন্তরিকভাবে চিকিৎসা করেন।
১৯৪২-এর আন্দোলনের পর ৭৮টি বসন্ত পার হয়ে গেছে। জেলার দুজন শহীদ চুনারাম মাহাত ও গােবিন্দ মাহাতর স্মৃতি এখনও জাগরুক। তার প্রমাণ শহীদদের স্মৃতিতে মূর্তি স্থাপন হচ্ছে তাঁদের বধ্যভূমিতে। আজ জেলাবাসীর গর্বের দিন।
চুনারাম মাহাত : জন্ম-৩.২.১৯২৪, মৃত্যু-৩০শে সেপ্টেম্বর ১৯৪২, গ্রাম-কুদা, থানা-মানবাজার। পিতা – পালহান মাহাত, স্ত্রী-মেথিবালা (মৃত্যু ১৯৯২)।প্রথাগত বাল্যশিক্ষা নেই। রাজনােয়াগড়ের আনন্দ আশ্রমের শ্রীশ ব্যানার্জীর নিকট ৬ বৎসর বয়সে রাজনীতিতে দীক্ষা (১৯৩০)। ১৯৩২ সালে আট বছর বয়সে সত্যাগ্রহ করে পাটনা ক্যাম্প জেলে ছয় মাসবন্দী। ১৯৩৯ সালে রামগড় কংগ্রেসে পায়ে হেঁটে যােগদান। ১৯৪২ সালে মানবাজারে পুলিশের গুলিতে শহীদ (আঠার বছর বয়সে)।
গােবিন্দ মাহাত : জন্ম-৭.৭.১৯২৪, গ্রাম-নাথুরডি, থানা-মানবাজার, পিতা-বিশ্বনাথ মাহাত, স্ত্রী-সিন্ধুবালা। প্রথাগত শিক্ষা নাই। রাজননায়াগড়ের আনন্দ আশ্রমে শ্রীশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে রাজনীতিতে দীক্ষা। ১৯৩২-এ সত্যাগ্রহ করার জন্য পাটনাক্যাম্প জেলে কারারুদ্ধ। ছয় মাসের জেল, ৫০ টাকা জরিমানা। জরিমানার টাকা না দিতে পারায় পিতৃদেবের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক। দ্বিতীয় আইন অমান্য আন্দোলনে আরও চার মাসের জেল। ১৯৩৯-এ রামগড় কংগ্রেসে যােগ দেন। ১৯৪০ সালেসত্যাগ্রহে ছয় মাসের কারাবাস। ১৯৪২-এর ৩০শে। সেপ্টেম্বর সকালে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে পুরুলিয়া হাসপাতালে শহীদ। কারাের কারাের মতে পথিমধ্যে প্রয়াণ হয়।
শহীদদ্বয়ের স্মৃতিতে তৈরী হয়েছে। ‘চুনারাম-গােবিন্দ বিদ্যাপীঠ। কুমারী নদীর সেতু শহীদ চুনারাম-গােবিন্দর নামে উৎসগীত। ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ শহীদদ্বয়ের মূর্তি স্থাপন স্মরণযােগ্য। ৩০ লক্ষ জেলাবাসীর শহীদদ্বয়কে প্রণাম।
শেয়ার করুন