নিজস্ব সংবাদদাতা , পুরুলিয়া :
২০ অক্টোবর , ২০২০
এবছর পরিস্থিতি কোভিড আক্রান্ত। এরই মধ্যে শারদোৎসব। সরকারি বিধি-নিষেধের কড়াকড়ি রয়েছে। তাই পুজোর ক’টা দিন মূল গেটে ঢােকার মুখেই ইউনিয়ন ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবকরা মাস্ক ও স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করছেন। জানালেন পুরুলিয়া ইউনিয়ন ক্লাবের সম্পাদক মণিদীপ চট্টোপাধ্যায় ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৌশিক মিত্র। তাঁরা বলেন, গেটের মুখেই দর্শনার্থীদের স্যানিটাইজ করা হবে এবং যাঁদের মাস্ক থাকবেনা তাঁদের ক্লাবের পক্ষ থেকে মাস্ক বিতরণ করা হবে। যেহেতু ক্লাবে বিশাল মাঠ রয়েছে, তাই সামাজিক দূরত্ব বিধি বজায় রেখে ঠাকুর দর্শন ও বাধ্যতামূলক হয়েছে এবছর বলে জানান তাঁরা।
দীর্ঘ ১১১ বছরের পুরানাে এই ক্লাবের পুজো একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী অন্যদিকে তেমনি এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ব্রিটিশ শাসকদের বিরােধিতার সাক্ষ বহন করে আসছে শতবর্ষের অধিক সময় ধরে।
১৯০৯ সালের ১ লা ডিসেম্বর পুরুলিয়া ইউনিয়ন ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হয়। তবে এর পেছনে আছে। একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।বর্তমানে পুরুলিয়া ইউনিয়ন ক্লাবের সভাপতি তথা জেলার প্রবীণ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সহ সভাপতি তথা পুরুলিয়া জেলা আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী হিমাদ্রী চট্টোপাধ্যায় বলেন, মূখ্যত ব্রিটিশদের বিরােধিতা করে শুরু হয়েছিল এই ক্লাব।তাঁদের বক্তব্য, সেটা ১৯০৯ সাল। সারা দেশে ব্রিটিশদের রাজত্ব। পুরুলিয়া শহরে ব্রিটিশদের একটি ক্লাব ছিল “অফিসার্স ক্লাব”। বর্তমানে যা পুরুলিয়া ক্লাব নামে পরিচিত। সে সময় পুরুলিয়া জেলা আদালতের এক উকিল (তখন আইনজীবীদের উকিল বাইংরেজি Vakil বলা হত) ধূতি পাঞ্জাবি পরে অফিসার্স ক্লাবে গেলে ব্রিটিশরা তাঁকে “ব্লাডি নেটিভ বেঙ্গলি” বলে অপমান করে। তৎক্ষণাৎ ওই বাঙালি উকিল বাবু ক্ষোভে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। পরের দিনই পুরুলিয়া জেলা আদালত চত্বরে অন্যান্য বাঙালি উকিলদের সঙ্গে আলােচনা করেন। বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও হিমাদ্রী চট্টোপাধ্যায় জানান, সেসময় পুরুলিয়া জেলা আদালতে রামচন্দ্র সিনহা, ললিত কিশাের মিত্র, শরৎ চন্দ্র সেন, সতীষ চন্দ্র সিনহা, সুরেশ চন্দ্র সরকারদের মতাে উঁদে ও ভীষণ প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্বরা আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই তৎকালীন ব্রিটিশ সময়ের সরকারি প্লিডারও ছিলেন। মূলত এঁদেরই উদ্যোগে ১৯০৯ সালের ১ লা ডিসেম্বর পুরুলিয়া ইউনিয়ন ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হয়।
পুরুলিয়া ইউনিয়ন ক্লাবের নিজস্ব সংবিধানও রয়েছে। শুরু থেকেই প্রতি বছর রীতিমত নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালন সমিতির সদস্যরা নির্বাচিত হন বলেও মত ক্লাব কর্তাদের। প্রথমে বছর দুয়েক পােস্ট অফিস মােড় ও মুনসেফডাঙায় ভাড়া ঘরে ক্লাব চলার পরে ১৯১১ সাল নাগাদ বর্তমান ক্লাব বিল্ডিংটি পাঁচ হাজার টাকায় বর্ধমান রাজার কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট জমিটি সহ কেনা হয়। বিল্ডিংটি তৎকালীন বর্ধমান রাজার খাজাঞ্জি খানা ছিল বলে জানান ক্লাব কর্তারা। বিল্ডিংটির নাম ছিল হােয়াইট হাউস। মােটামুটি তখন থেকেই শুরু হয় দুর্গা পুজোরও।
ক্লাবের পক্ষে মণিদীপ চট্টোপাধ্যায় ও কৌশিক মিত্র বলেন, পুজো চারদিনই শাস্ত্রীয় প্রথা মেনেপুজো হয়ে আসছে একচালা দেবী মুর্তির। এই পুজোতে বাঙালির ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে মত তাঁদের। এক সময় পুজোর চারদিনই ক্লাব সদস্যদের ধূতি-পাঞ্জাবি পরে মন্ডপে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক থাকলেও বর্তমানে সেসব নিয়ম নেই। তবে পুজোর সেই সূচনা লগ্ন থেকে সপ্তমী থেকে নবমী,পুজোর তিনদিনই সমস্তসদস্য ও তাঁদের পরিবারের জন্য দুবেলা খিচুড়ি, পােলাও,লুচি-তরকারির প্রসাদের প্রথা আজও বিদ্যমান। প্রসাদ অবশ্য দর্শনার্থীদেরও
বিতরণ করা হয়। কিন্তু এবছর কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কিছু বিশেষ বিধি মানতে ক্লাবের সদস্য সহ দর্শনার্থীদের জন্য প্রসাদ বিতরণ বন্ধ থাকবে বলে জানান সম্পাদক মণিদীপ চট্টোপাধ্যায়।
কৌশিক মিত্র বলেন, এইপুজোর বৈশিষ্ট হল, সেই সূচনা লগ্ন থেকেই ক্লাবের আয় থেকেই এই পুজো হয়ে আসছে। বাইরে থেকে কোনাে দিনই কোনাে আর্থিক সংগ্রহ করা হয় না।
