নিজস্ব সংবাদদাতা, কাঁটাডি, বুধবার, ৭ জুন ২০২৩:

মণিকা রুহিদাস আর পারমিতা সিং সর্দার। এই দুজনই এবছর কাঁটাডি শিক্ষাসত্র বিদ্যালয় থেকে কলা বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। শুধু উত্তীর্ণই হয়নি। মণিকা পেয়েছে ৯১.৮ শতাংশ নম্বর আর পারমিতার প্রাপ্তি ৭৪.৪ শতাংশ। দুজনেরই বক্তব্যে একটি সাধারণ মিল হচ্ছে, “উচ্চ শিক্ষা লাভ করে জীবনে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করা”। আর দুজনেরই এই পথে প্রধান অন্তরায় চূড়ান্ত আর্থিক অস্বচ্ছলতা।

মণিকা রুহিদাসের বাড়ি কাঁটাডিতেই। তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, মণিকার যখন মাসখানেক মাত্র বয়স, তখনই তাকে ও তার মা কবিতা রুহিদাসকে ছেড়ে তার বাবা অন্যত্র চলে যান। তবে দমে যাননি কবিতা দেবী। বাড়িতে বাড়িতে বাসন মেজে, কাপড় কেচে সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়ে মণিকাকে লেখাপড়া করিয়েছেন। মণিকার মামা লালমোহন রুহিদাস জানান, শত অভাবেও দিদি মণিকার পড়াশুনো বন্ধ হতে দেননি। বছর দুয়েক হল কাঁটাডি স্টেশনে চুক্তি ভিত্তিক ঝাঁট দেওয়ার কাজ পেয়েছেন মণিকার মা কবিতা। তবে বেতনও খুবই সামান্য আর কাজের নিশ্চয়তাও নেই। মাঝেমধ্যেই সে কাজও থাকে না। ফলে অভাবের সংসারে মণিকার উচ্চ শিক্ষা এবার যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, কবিতা দেবীর আশঙ্কা তেমনই। অন্যদিকে মণিকার ইচ্ছে সে “একদিন ডব্লিউ বি সি এস অফিসার হবে”। ইংরেজি তার প্রিয় বিষয়। উচ্চ মাধ্যমিকে ইংরেজিতে পেয়েছে ৯৬। ইংরেজিতে অনার্স নিয়েই স্নাতক স্তরে পড়তে চায় মণিকা। তবে সাংসারিক অনটন কি তার উচ্চ শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে? এখন এই চিন্তাতেই ঘুম ছুটেছে মণিকার। কবিতা রুহিদাসের সাফ বক্তব্য,” সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পেলে খুব ভালো হয়। মেয়েটার লেখাপড়াটা হবে”।

অন্যদিকে পারমিতা সিং সর্দারের বাড়ি চাটুহাসা পঞ্চায়েতের কিনুটাঁড়ে। অভাবের সংসার। সহজ সরল মেয়েটির কথা, “বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার মত দূরের শিক্ষাসত্র স্কুলে যেতাম সবুজসাথীর সাইকেলে”। বাবা প্রদীপ সিং সর্দার পেশায় চাষী। যেটুকু চাষবাস করেন তাতে কোনভাবে টেনেটুনে বছরের কয়েকটা মাস সংসরটা চলে। বছরের বাকি সময় অন্যের ক্ষেতখামারে কাজ করে বা দিনমজুরি করে উপার্জন করেন। মা মীরা সিং সর্দার গৃহবধূ। তিনি বলেন, “সংসারের অভাব আর যায়না। মেয়েটার লেখাপড়ায় ভীষণ ইচ্ছে। এতদিন চালিয়েছি কোনভাবে। এরপর কি হবে জানিনা”। সাংসারিক অনটনের জেরে তার উচ্চ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তা নিয়ে পারমিতা নিজেও যথেষ্ট উৎকন্ঠায় রয়েছে। তবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নও যে মনে ডানা মেলে রয়েছে। পারমিতার অকপট বক্তব্য, জীবনে শিক্ষিকা হতে চাই। এই পেশায় নিজেকে দেখতে তার সেই কোন ছোট বয়স থেকেই ইচ্ছে। প্রিয় বিষয় ভূগোল। ইংরেজিও খুব ভালো লাগে তার। ভূগোল ও ইংরেজি দুটি বিষয়েই এবার সে পেয়েছে ৮০। তবে ভূগোলে অনার্স নিয়ে স্নাতক স্তরে ভর্তি হতে চায় পারমিতা। তার মা মীরা দেবী বলেন, “কি হবে জানি না। সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা ছাড়া মেয়ের উচ্চ শিক্ষা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবো কি না এখুনি বলা খুব মুশকিল”।

শেয়ার করুন

You cannot copy content of this page