বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়, প্রধান শিক্ষক, চিত্তরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়
ম্যাকলে সাহেব ভারতীয়দের থেকে কিছু ইংরেজী জানা করণিক চেয়েছিলেন। যার জন্য তার বিখ্যাত মিনিটে … তিনি এদেশে ইংরাজী শিক্ষা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। প্রাচীন ভারতের গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থাতে সমাজের সমস্ত শ্রেণির (লিঙ্গ নির্বিচারে) মানুষের অবাধ সম্পৃক্ততা ছিল। ভাষা, ব্যাকরণ, গণিত শাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান,অশ্বারােহন, ধনুর্বিদ্যা এমনকি আয়ুর্বেদীয় শল্য চিকিৎসা গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থায় অঙ্গীভূত ছিল। মধ্যযুগীয় অমানিশা ও রাজ পৃষ্ঠপােষকতাহীনতার কারণে বরাহমিহির,আর্যভট্টদের উত্তরসূরীগণ সমাজ থেকে হারিয়ে গেলেন। সুদীর্ঘকাল যাবৎ ভারতবাসী তার অতীত ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষাকারী উল্লেখযােগ্য সে রকম কিছুউদ্ভাবনী দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি।
প্রায় ৬০০ বছরের দিনগত পাপক্ষয়ের অবসান হলাে উনবিংশ শতকে বৃটিশের হাত ধরে পাশ্চাত্য শিক্ষার আবির্ভাবে। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে – উনবিংশ শতকের পূর্বে। ভারতে কি কোনরূপ শিক্ষা ব্যবস্থার অস্তিত্বই ছিল না? অবশ্যই ছিল। টোল চতুস্পাঠী এবং মাদ্রাসা মকুব ছিল। যেগুলােতে ভাষা (সংস্কৃত ও আরবী, ফার্সী) ব্যাকরণ ও কিঞ্চিত গণিত ব্যতিত কিছুই ছিল না। এই শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজকে দিয়েছে কিছু গোঁড়া,ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিত ও পরমত অসহিষ্ণু কট্টর । স্বভাবতই সাধারণ আপামরভারতবাসীর মধ্যে এই শিক্ষার প্রতি বিশেষ ভালােবাসা ছিল না। কালক্রমে জাতি শিক্ষা বিমুখ হয়ে পড়ে।
পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থায় অঙ্গীভূত আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান, গণিত, ভূবিদ্যা ও বিশেষত ইংরাজী ভাষা শিক্ষা ভারতবাসীকে টুলিয় কূপমণ্ডুকতা থেকে রক্ষা করে। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ভারতীয় মেধার বিকাশের পথ এতদিন রুদ্ধ ছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে পুনরায় পরাধীন ভারতবাসী গণিত, বিজ্ঞান সাহিত্যে তার ব্যুৎপত্তির স্বাক্ষর রাখতে শুরু করে। রামানুজন, সি.ভি.রামন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু এরা ভারতীয় আধুনিক শিক্ষার ফসল।
তাহলে এমন কি ঘটল যে স্বাধীনােত্তর ভারতবর্ষে রমন, রবীন্দ্রনাথদের উঠে আসা বন্ধ হয়ে গেল। শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে অনেক বেশী আধুনিক ও বিষয় বিবিধতা সমৃদ্ধ। তবুও বর্তমানে দেশে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন বা চিকিৎসা বিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণালব্ধ সাফল্য অকিঞ্চিতকর। রামনের পর পদার্থবিদ্যায় আর নােবেল কোথায়। এন.আর.আই বিজ্ঞানীদের সাফল্য নিয়ে মাতামাতি ১৩০ কোটি ভারতবাসীর শােভা পায় না। এ রকম আচরণ ব্যর্থতা চাপা দেবার নির্লজ্জ প্রয়াস ছাড়া কিছু নয়। তাহলে সমস্যাটা কোথায় ? সমস্যা সামাজিক অতিআধুনিকতায়। ইহা মূল্যবােধ নির্ভর ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয় সূচিত করে। যেটা পরাধীন ভারতবর্ষে কল্পনারও অতীত ছিল। মেধাসম্পন্ন ছাত্রগণ মৌলিক বিজ্ঞানে আকৃষ্ট না হয়ে ডাক্তারি বিদ্যা অর্জনে আগ্রহী হলে তা শিক্ষা বা উক্ত ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে নয়। এর জন্য দায়ী সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী। আর সামাজিক ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে দেশীয় মূল্যবােধ ও পরম্পরা থেকে।
স্বাধীনােত্তর ভারতবর্ষের নানান শিক্ষা কমিশনের রিপাের্ট ও শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে শিক্ষার কলেবরে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ততটা দেওয়া হয়নি তাঁর আত্মায়। অর্থাৎ ভারতীয় শিক্ষা চটকদার খাঁচা সর্বস্ব হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ শিক্ষার্থীদের মূল্যবােধের শিক্ষা না দেওয়া। শিক্ষা পদ্ধতিকে তথাকথিত আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক রাখার বামমাগীয় প্রয়াস কয়েক প্রজন্মের ভারতবাসীকে ভােগ ও আত্মসর্বস্ব রােবটে পরিণত করেছে। এরা যে অর্থ ও সম্পদের পিছনের ছুটবে এতে আর আশ্চর্যের কিআছে। শৈক্ষিক চেতনা সামাজিকধ্যান-ধারণা বদলাতে পারে। তার নজির প্রচুর রয়েছে।
ভারতে প্রয়ােজন জড়বাদী পাশ্চাত্য শিক্ষা ও মূল্যবােধ নির্ভর আধ্যাত্ম চেতনাসমৃদ্ধ ভারতীয় শিক্ষার সংশ্লেষ। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষা কালের নিরিখে অনাধুনিক নিশ্চয় কিন্তু তবু বলব আধুনিক ভারতীয় শিক্ষার সর্বোচ্চ সাফল্যের নিমিত্ত ফেলে আসা নিখাদ ভারতীয় মণিমুক্তার অন্বেষণ ও সংবন্ধন প্রয়ােজন। একমাত্র তাহলেই শিক্ষা-শিক্ষার্থী, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সম্ভব। ভারতীয় গবেষক দেশে বসে,দেশীয় প্রযুক্তির উন্নতি সাধনের মাধ্যমে আবার আলােড়ন সৃষ্টিকারী সাফল্য পেতে পারেন। শ্রী অমর্ত্য সেন ও বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফল্যে ভারতবাসীমাত্রেই গর্বিত। কিন্তু তবুও কেমন যেন অতৃপ্তি থেকে যায়। তাঁদের সাফল্য যেন মাটির গন্ধহীন যা আপামর ভারতবাসীকে সেইভাবে স্পর্শ করে না।
প্রতি বছর ৫ই সেপ্টেম্বর দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলােতে শিক্ষক দিবস পালিত হয়। ছাত্রদের দ্বারা শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ সম্মানিত হন আনুষ্ঠানিকভাবে। ছাত্রদের উৎসাহ চোখে পড়ার মতােই থাকে। এ বছর বৈশ্বিক মহামারী করােনার দাপটে শিক্ষাঙ্গন ছাত্রমুক্ত। এ যেন ঠিক মণিহারা ফণির মতাে। অভিভাবক-অভিভাবিকাদের সান্নিধ্য শিক্ষার্থীদের অভাব পূরণ করতে পারে না। এই যান্ত্রিকতা প্রাণের আরাম ও হৃদয়ের তৃপ্তির অন্তরায়। এদিন সমারােহের আতিশয্য ও আনুষ্ঠানিকতার তাগিদ ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আমাদের কিছু বলিয়ে নেয়। এ বছর সে সবের কোন ব্যাপারই নেই। তাই শিক্ষক শিক্ষিকাদের আহ্বান – আসুন আমরা আজকের দিনে আন্তরিক অঙ্গীকার করি, প্রচলিত ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার শাপমােচনের লক্ষ্যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থাকে হৃদয়ঙ্গম করি।
শেয়ার করুন