নিজস্ব সংবাদদাতা , বাঘমুন্ডি
৮ সেপ্টেম্বর , ২০২০

আকলু মাছুয়ার নিজে রাজ্য সরকার স্বীকৃত শিল্পী, ইউরোপ, আমেরিকার বহু দেশ ঘুরেছেন তাঁর শিল্পের জন্যই, মৃণাল সেনের সিনেমার নেপথ্য সঙ্গীতে বাজিয়েছেন বাঁশি। গত দু’বছর আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। তাঁর স্ত্রী, রাসেশ্বরী মাছুয়ার ঘোরতর বাম আমলেও তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন, বিগত কয়েক বছর যাবৎ ঘোরতর মানসিক রুগি। স্বামী-স্ত্রীর সংসারের আরেকজন এঁদের মানসিক রোগগ্রস্ত বিবাহ বিচ্ছিন্না মেয়ে। তিনজনের এই সংসারে আজ চরম অভাব, অনটন। চিকিৎসার খরচ জোগাড় তো দূর অস্ত। “মাসিক এক হাজার টাকা শিল্পী ভাতা আর রেশনের চাল, এইটুকুই সম্বল আমাদের” বলছেন আকলু মাছুয়ার। বলেন, “যেখানে খাওয়া-পরা জোগাড়ই দুষ্কর, সেখানে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা তো পাহাড় সরানোর কাজ”।

বাঘমুন্ডি গ্রামের বাসিন্দা আকলু মাছুয়ার। বয়স নিজে বললেন ৮৫ বছর। ছেলেবেলায় বাঘমুন্ডির রাজ বাড়ির ছাগল-গরু চরাতেন। জানালেন, সেখানেই নিমাই প্রসাদ সিং দেও এবং কানাই প্রসাদ সিং দেও-র সংস্পর্শে এসে সুরের প্রতি অনুরাগ। আড় বাঁশি, বাঁশি (ফ্লুট) এবং করনেট বাজানোতে পারদর্শী আকলু মাছুয়ার। জেলার দুই প্রয়াত পদ্মশ্রী ছৌ শিল্পী গম্ভীর সিং মুড়া ও নেপাল মাহাতর ছৌ দলে চুটিয়ে বাঁশি বাজিয়েছেন দীর্ঘদিন। এঁদের দলের সঙ্গেই ছৌ নৃত্য প্রদর্শনে আমেরিকার চিকাগো ও লস এঞ্জেলস, প্যারিস, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, থাইল্যান্ড ভ্রমন করেছেন নিজের শিল্পী স্বত্ত্বাকে সঙ্গী করে। ১৯৮৭ সালে প্রয়াত চিত্র পরিতালক মৃণাল সেনের মৃগয়া চলচ্চিত্রের ছৌ নাচের দৃশ্যগুলিতে নেপথ্যে বাঁশি বাজিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে একটু বয়স বাড়লে স্থানীয় সংকীর্তন দলগুলির সঙ্গে জেলাজুড়ে ঘুরেছেন বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে রুজির কারনে। তবে বাধ সেধেছে দুবছর আগের প্যারালাইটিক স্ট্রোক। বর্তমানে আর বাঁশি বাজিয়ে ঘুরতে পারেন না। লাঠিতে ভর দিয়ে কোনভাবে চলেন। শরীরের একদিক অকেজ প্রায়। মোটামুটি সেই সময় থেকেই শুরু হওয়া মাসিক এক হাজার টাকার শিল্পী ভাতা আর রেশনের চালটুকুই ভরসা তাঁদের, বলছেন আকলু মাছুয়ার।

আকলু মাছুয়ারের স্ত্রী রাসেশ্বরী মাছুয়ার ঘোরতর বাম আমলে তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন বাঘমুন্ডি পঞ্চায়েতে। সময়টা ছিল ১৯৯৮ থেকে ২০০৩। তিনি বিগত কয়েক বছর যাবৎ সম্পূর্ন ভাবে মানসিক রোগী। মানসিক রোগগ্রস্ত বিবাহ বিচ্ছন্না মেয়েরও বিগত কয়েক বছর ধরে ঠাঁই হয়েছে এই অভাবের সংসারে। চার ছেলে। আকলু মাছুয়ার বলেন, প্রত্যেকেই দিনমজুরি করে খায়, পরিবার পালে। আলাদা থাকে প্রত্যেকেই। সাহায্য কিছুই পাই না। কেননা ওদেরই কোনভাবে দিন গুজরান হয়, আমাদের আর কি সাহায্য করবে। এই অবস্থায় তিনজনের সংসারে যে চরম অনটন, তাতে চিকিৎসা যে তাদের কাছে আতিশয্য, সেটা একপ্রকার স্বীকারই করেছেন আকলু মাছুয়ার। দীর্ঘদিন ধরে তালিকায় নাম থাকলেও একটা ঘরও জোটেনি আবাসের। বললেন, “এখন আর এই শরীর নিয়ে বারবার খবর নিতে যেতে পারিনা। যা কপালে আছে হবে”। না, অভিযোগ নেই সহজ মানুষটার কথায় বরং আক্ষেপ যেন ফুটে উঠছে। আর, বাম আমলের সেই তৃণমূল প্রধান রাসেশ্বরী মাছুয়ার! এই নিরুত্তর পৃথিবীর দিকে তাঁর অসাড় দৃষ্টি যেন নিবদ্ধ।

শেয়ার করুন

You cannot copy content of this page