বিশ্ব মাইতি , পুরুলিয়া
৪ আগস্ট , ২০২০
আড়ষার যুবক সঞ্জয় কুমার। গুজরাটের এক কারখানার সুপারভাইজার। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ১৪দিনের নিভৃতবাস কাটিয়ে পাড়ার মোড়ে এসে বসেছে। পুরাতন বন্ধুদের কেউ এসে দেখা করছে, বড়রা স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছে। দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে বিকাশ মাহাত। সঞ্জয়ের হাতের মোবাইল, ঝকঝকে জামা, হাতের ঘড়ি ও আঙুলের সোনার আংটি জরিপ করছিল সন্তর্পণে। বিশ বছর আগের এক থালায় ভাত খাওয়া বন্ধু তাঁরা। শৈশবের বন্ধুকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও বিকাশ থমকে দাঁড়ায়। মাঝে যেন ব্যবধানের পাঁচিল। বাড়ি ফিরে সাত পাঁচ ভাবতে থাকে বিকাশ। সেবার রুখা জমিতে পরপর দু’বছর ধান হয়নি। স্কুলের পাট চুকিয়ে এক মাসির ছেলের হাত ধরে ওই বয়সেই সঞ্জয় পাড়ি দিয়েছিল গুজরাট। কিন্তু বিকাশকে বাবা মন্মথ মাহাত বলেছিল, যত কষ্টই হোক শহরের বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিতে হবে। শহরের বাবুদের মতো অফিসের চাকরি করতে হবে। আজ একের পর এক কারখানা ঘুরে সঞ্জয় বহুজাতিক কোম্পানির সুপারভাইজার। ৩৫-৪০হাজার মাস মাইনে। আর সে চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত। ফরম ফিলাপের টাকা জোগাড় করার জন্য ১০০দিনের কাজে ঝোড়া-কোদাল হাতে মাঠে নামতে হয় প্রায়শই।
ঘোরের মধ্যে থাকা বিকাশের কানে পাশের ঘরের টিভি থেকে ভেসে আসছে নতুন শিক্ষা নীতির ঘোষণা। পক্ষে ও বিপক্ষে কত মত! কেউ সমর্থনে রাস্তায় নামছে, কেউবা বিক্ষোভে মাতছে। কেউ বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কম্পিউটারে কোডিং শিখলে দেশ তরতরিয়ে এগোবে, বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এবার ইচ্ছেমতো অর্থনীতি ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ পাবে, আইআইটিতে কলা বিভাগের পঠন পাঠন হবে, এমবিবিএস চিকিৎসকদেরও এবার হোমিওপ্যাথি,ইউনানি, যোগের পাঠ পড়ানো হবে। আবার কেউ বলছে, শিক্ষায় বানিজ্যকরণের পথ প্রশস্ত হল, বড় পুঁজি বিনিয়োগের রোড ম্যাপ মেনেই এই শিক্ষানীতি। কেউ আবার জোর গলায় বলছে, যৌথ তালিকার শিক্ষা ব্যবস্থায় রাজ্যের ক্ষমতা খর্ব করা হল, মাধ্যমিক তুলে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের গিনিপিগ করা হচ্ছে, কেউ বলছে শিক্ষার গৈরিকীকরণের চূড়ান্ত রূপ নতুন শিক্ষানীতি। ঘোরের মধ্যে থাকা বিকাশের গাল দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। ঝাপসা চোখে হাজারো প্রশ্নের ভিড়। চিৎকার করে তাঁর বলতে ইচ্ছে করছে, নতুন হোক বা পুরাতন, আমার ডিগ্রির কাগজটাতো মিথ্যে নয়। চাকরি চাই, কাজ চাই, পেটে ভাত চাই, সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই।
শুধু আড়ষার বিকাশ নয়, এমন লক্ষ কোটি বিকাশ আজ ছড়িয়ে রয়েছে দেশের নানা প্রান্তে। যাদের কাছে নতুন শিক্ষা নীতি নিয়ে আলোচনা স্রেফ বিলাসিতা। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পাশের ডিগ্রি স্রেফ কেজি দরে বিক্রির জন্য বাড়িতে পড়ে থাকা পুরাতন কাগজ মাত্র। নিউ ইন্ডিয়া, স্কিল ইন্ডিয়া, বছরে এক কোটি চাকরির স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় বিকাশরা রোজ রাতে হাহাকার করে কাঁদে। পণ্ডিতদের মুখে ঘুরে বেড়ায় ১০১ বছর আগে কবিগুরুর লেখা সেই প্রশ্ন, ‘শিক্ষাকে আমরা বহণ করিলাম, বাহন করিলাম না’। আচ্ছা, নতুন শিক্ষা নীতি আসুক বা পুরাতন, তাতে আমার আপনার পরিবারের ছেলে মেয়েদের আখেরে কিলাভ বলুনতো? কি মৌলিক পরিবর্তন হবে ছাত্রছাত্রীদের জীবনে। তাহলে চলুন বাস্তব পরিস্থিতিটা একটু দেখে নেওয়া যাক। দেশের বেকারত্ব নিয়ে কাজ করা স্ব-শাসিত সংস্থা সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি। এই সংস্থা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দেশের ১লক্ষ ৭৪হাজার ৪০৫টি পরিবারে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই সময় দেশের বেকারত্বের হার ৭.৫শতাংশ। ২০১৭সালের ওই সময় বেকারত্বের হার ছিল ৩.৮শতাংশ। গত বছর বেকারত্বের হার ‘ইন্ডিয়া’ অর্থাৎ শহর এলাকায় ছিল ৯শতাংশ ও গ্রামীণ ভারতে ছিল ৬.৮শতাংশ। কিন্তু যুবকদের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর। ২০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৭শতাংশ। তাঁদের মধ্যে স্নাতক(গ্র্যাজুয়েট) হওয়া যুবক ও যুবতীদের বেকারত্বের হার ৬০শতাংশ। সার্বিকভাবে শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ৬৩.০৪শতাংশ। বেসরকারি সংস্থা যতই বিশ্ববন্দিত হোক না কেন তাঁর পরিসংখ্যান নিয়ে একাংশ প্রশ্ন তুলবেননা তাতো হয়না। চলুন, এবার সরকারি পরিসংখ্যান একটু দেখে নেওয়া যাক। ২০১৫ সালে আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনায় স্কিল ইন্ডিয়া চালু করা হয়েছিল। চাকুরির আশ্বাস পাওয়া শিক্ষিত যুবক যুবতীরা ভিড় জমিয়েছিলেন মফঃস্বলের ঝাঁ চকচকে সেইসব অফিসে। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই স্কিল ইন্ডিয়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল দেশের ৬৪লক্ষ ২৭হাজার চাকুরি প্রত্যাশীকে। তাঁদের মধ্যে ১৫-২৫ হাজার টাকার মাসিক মাইনেতে চাকরি পেয়েছিলেন মাত্র ১৪লক্ষ ৪৩হাজার। যাদের সকলেই বেসরকারি সংস্থায় কাজ পেয়েছিলেন। লকডাউন ও করোনা পরিস্থিতিতে তাঁদের সিংহভাগ কাজ হারিয়েছেন।
আসলে দেশের মূল সমস্যা কর্মসংস্থান। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া গেল, রাষ্ট্র শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে আধুনিক ও বাস্তব উপযোগী শিক্ষা নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু এরফলে তৈরি হওয়া উন্নত মানব সম্পদ হোমে লাগবে নাকি যজ্ঞে? বলা হচ্ছে, কোনও ছাত্র বা ছাত্রী ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তার প্রায়োগিক দিক হিসেবে যেকোনও জায়গায় কাজ করতে পারে। ওই কাজ পঠন পাঠনের অংশ হিসেবে যেমন ধরা হবে, তেমন উপার্জনেরও মাধ্যম হবে। কিন্তু যে দেশে স্কিল ইন্ডিয়ার প্রশিক্ষণ প্রাপ্তরা বসে থাকে, ব্লকে ব্লকে তৈরি হওয়া আইটিআই ও পলিটেকনিকের ছাত্ররা ১০০ দিনের কাজ করতে বাধ্য হয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মেধাবী ছাত্ররা একের পর এক ক্যাম্পাসিং দিয়েও চাকরি না পেয়ে হতাশায় গলায় দড়ি নেয়, সেই দেশে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা কি কাজ পাবে? আচ্ছা, যদি ধরেও নেওয়া হয় তারা কাজ পাবে, তাহলে বর্তমানে স্কুলে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা নিশ্চই কাজ পেয়েছেন? বাস্তব কি বলছে? তাঁরা কেন কাজ পাচ্ছেননা? অনেকে বলতে পারেন, সরকার কতজনের দায়িত্ব নেবে? নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। অর্জিত শিক্ষাকে হাতিয়ার করে জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে জয়ী হতে হবে। চপ ভাজাও শিল্প, চা দোকানও কত কর্মসংস্থান তৈরি করে। আচ্ছা, শিক্ষিত বেকাররা চা বা চপ দোকান না করে অন্য ব্যবসা করতে চাইলে,রাষ্ট্র কতটা পাশে থাকছে? গালভরা অনেক প্রকল্প থাকলেও সকলেই জানে ব্যাঙ্ক লোন দেয় নীরব মোদি, মুকেশ আম্বানির মতো লেজ ওয়ালাদের। কোনও সুপারিশ ছাড়া সাধারণ কাউকে ব্যাঙ্ক থেকে ১০হাজার টাকা লোন নিতে গেলে জুতোর শুখতলাও খুইয়ে ফেলতে হয়। এই পরিস্থিতিতে নতুন ব্যবসার উদ্যোগ নিলে টাকার জোগান কে দেবে? রাষ্ট্র তাহলে কোন দায়িত্ব নেবে? অনেকে বলতে পারেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু কর্মসংস্থানেই বন্দি। চরিত্র গঠন কি মূল উদ্দেশ্য নয়? বিনীত ভাবে আপনাদের বলছি, পারিবারিক শিক্ষায় চরিত্র গঠন হয়না এমন ধারণা আপনাদের কিভাবে তৈরি?
বিকাশের মতো লাখো যুবাদের কাছে, স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া শিখে চরিত্র গঠনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও মূল উদ্দেশ্য। হ্যাঁ কর্মসংস্থান মূল উদ্দেশ্য। বিকাশের মতো কারোর বাবা মহাজনি ঋণ নিয়ে মাঠে চাষ করে,কেউ দিন মজুরি করেন, কেউ কারখানার অস্থায়ী শ্রমিক, কেউবা মাথায় মুটে বওয়ার কাজ করেন। লাখো বিকাশ একবেলা খেয়ে টিউশন করে ও বাবার পাঠানো টাকা জমিয়ে কলেজের ফিজ জোগাড় করে। তাঁদের প্রথম উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান, দ্বিতীয় উদ্দেশ্য একমাত্র কর্মসংস্থান। একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে বেসরকারি হাতে তুলে দিয়ে দেশের শিক্ষিত বেকারদের স্বার্থ রক্ষা হয়না। অবসরের দোরগড়ায় দাঁড়ানো বৃদ্ধদের চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে কিংবা অবসরপ্রাপ্তদের নতুন করে কাজে ঢুকিয়ে শিক্ষিত বেকারদের ভবিষ্যত তৈরি করা যায়না। নতুন চাকরির পরিকাঠামো তৈরি না করে অচ্ছে দিন আনা যায়না। ফের নতুন স্বপ্নে যুবদের কিছুদিন বিভোর করানোর উদ্দেশ্য থাকলে নতুন শিক্ষা নীতি একশোয় একশো! সোনার পাথর বাটি দেখিয়ে গণেশকে দুধ খাওয়ানোর গল্প বাস্তবে বেশিদিন বিক্রি করা সম্ভব নয়।
