নিজস্ব সংবাদদাতা, পুরুলিয়া, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ঃ
আজ, শুক্রবার পুরুলিয়ায় সূচ কাণ্ডে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করল আদালত। নিজের সন্তানকে খুনের দায়ে শিশুর মা মঙ্গলা গোস্বামী এবং তাঁর সঙ্গী সনাতন গোস্বামীকে এদিন দোষী সাব্যস্ত করেন পুরুলিয়া জেলা আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক দ্বিতীয় কোর্ট রমেশ কুমার প্রধান। আগামী সোমবার মামলায় দোষী সাব্যস্ত দু’জনের সাজা ঘোষণা করা হবে বলেও এদিন জানানো হয়েছে।
পুরুলিয়া জেলা আদালতের ওই মামলার সরকারি আইনজীবী আনোয়ার আলী আনসারী জানান, সাড়ে তিন বছরের শিশুকে খুনের দায়ে পুরুলিয়া মফস্বল থানা এলাকার বাসিন্দা সনাতন গোস্বামী এবং মৃত শিশুর মা মঙ্গলা গোস্বামীকে খুন, ষড়যন্ত্র সহ একাধিক ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন বিচারক। সনাতন গোস্বামী এবং মঙ্গলা গোস্বামী দুজনেই জেল হেফাজতে রয়েছে। এই মামলায় ৩৭ জনের সরকারিভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সরকারি আইনজীবী এবং পুরুলিয়া জেলা আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলা গোস্বামীর বাপের বাড়ি ভুল সতেরো গ্রামে। তার বিয়ে হয়েছিল মফস্বল থানারই ঘঙ্গা গ্রামে। পরে স্বামীর সঙ্গে তার বনিবনা হয়নি। নদীয়াড়া গ্রামের সনাতন গোস্বামী মঙ্গলাকে পরিচারিকার কাজ করার বাহানায় নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে। সঙ্গে তার শিশু সন্তানও আসে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসের ১১ তারিখ মঙ্গলার ওই সাড়ে তিন বছরের শিশুকন্যা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে বাড়িতেই। অসুস্থ হলেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইছিল না তার মা। গ্রামবাসীরা কার্যত জোর করে একটি পুলিশ গাড়িতে ওই শিশুকে চাপিয়ে দেয়। পুলি সদর হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করে। তার মাও সঙ্গে ছিল। তবে সনাতন গোস্বামী ওই শিশু ভর্তির পর থেকেই বেপাত্তা হয়ে যায়। ওই শিশুর শরীরের একাধিক জায়গায় অত্যাচারের চিহ্ন ছিল। শিশুটির শারীরিক পরীক্ষা করে শরীরের ভেতরে সূচ জাতীয় কিছু থাকার কথা জানতে পারেন চিকিৎসকরা। পরে চাইল্ড লাইনের তৎকালীন কো-অর্ডিনেটর দীপঙ্কর সরকার পুরুলিয়া মফস্বল থানায় এবিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। ওই শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাকে বাঁকুড়া মেডিকেল কলেজে এবং পরে এসএসকেএম-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে ওই শিশুর শরীর থেকে সাতটি সূচ বের করে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সূচ গুলি আটকে ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই শিশুটি মারা যায়। কলকাতাতেই সৎকার করা হয় ওই শিশুর।
পুরুলিয়া জেলা আদালত সূত্রে আরো জানা গিয়েছে, ওই শিশুর মৃত্যুর পরই তার মা মঙ্গলা গোস্বামীকে পুরুলিয়া মফস্বল থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। মঙ্গলার বয়ানে নানারকম অসঙ্গতি থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ওই মাসেরই ২২ তারিখ। প্রথমে ঘটনার তদন্তকারী অফিসার ছিলেন অসীম সেনগুপ্ত। পরে ওই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় গোপালচন্দ্র মানকে। তাঁর নেতৃত্বেই চারজনের একটি টিম উত্তরপ্রদেশে গিয়ে পিঁপরি থানা এলাকা থেকে অভিযুক্ত সনাতনকে গ্রেপ্তার করে। প্রথমে তাকে উত্তর প্রদেশ থেকে ট্রানজিট রিমান্ডে পুরুলিয়া নিয়ে আসা হয়। মামলার তদন্ত করে পুলিশ জানতে পারে, বছর ৬২-র সনাতনের সঙ্গে বছর ২৩-এর মঙ্গলার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দুজনের সম্পর্কের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাড়ে তিন বছরের শিশু। তাই তাকে সরিয়ে ফেলতেই মঙ্গলার প্রত্যক্ষ মদতেই শরীরে একের পর এক সূচ ঢুকিয়ে দেয় সনাতন। এভাবেই বিভিন্ন সময় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মোট ৭ টি সূচ ঢোকানো হয়েছিল। বাড়িতে রেখেই ধীরে ধীরে ওই শিশুকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল সনাতন ও মঙ্গলা। পুরুলিয়া জেলা আদালত সূত্রে আরো জানা গিয়েছে, ওই মামলায় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত করে মামলা শুরুর মাত্র ৫৮ দিনের মাথায় চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ । মামলা চলাকালীন অন্যান্যদের পাশাপাশি মোট ১৮ জন চিকিৎসকের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। শুক্রবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও সনাতন এবং মঙ্গলা কার্যত নির্লিপ্তি ছিল। তবে ঘটনার বিষয়ে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।


